রাহাদ সুমন,বরিশাল ব্যুরো:
বরিশালের উজিরপুরে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে দুই বছরের অধিক সময় ধরে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি জবর দখল করে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে । ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি জবর দখল করে বাড়িসংলগ্ন মন্দিরের পাকা ফটকে ‘খান বাড়ি’ লিখে প্লাস্টার করে দেন তিনি।
এ সম্পত্তি দখলমুক্ত তো দূরের কথা সম্প্রতি
উল্টো পূর্বে সাঁটানো প্রধান ফটকের “খান বাড়ি” লেখা সাইনবোর্ড খুলে
মন্দিরের অফিস কক্ষের ভবনে সাঁটিয়েছে দখলদাররা।
ভুক্তভোগী উজিরপুরের সার্বজনিন কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরের সভাপতি বরুণ মিত্র দাবি করেন, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, বিএনপি নেতাসহ থানা পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও তিনি প্রতিকার পাননি। আগে সাধারণ ডায়েরি করেও ফল না পাওয়ায় সম্প্রতি উজিরপুর মডেল থানায় আবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। অভিযোগে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
উজিরপুর মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। এ বিষয়ে সম্প্রতি বরিশাল বরিশাল জেলা প্রশাসকের কাছে জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মানিক মুখার্জি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। হিন্দু পরিবারের বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলমুক্ত করার দাবিতে এ অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগ পেয়ে জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার উজিরপুর
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তবে এ সম্পত্তি দখলমুক্ত তো দূরের কথা উল্টো পূর্বে সাঁটানো প্রধান ফটকের “খান বাড়ি” লেখা সাইনবোর্ড খুলে মন্দিরের অফিস কক্ষের ভবনে সাঁটিয়েছে দখলদাররা। দখলমুক্ত করা নিয়ে ইউএনওর তালবাহানার
ফলে ভূক্তভোগী বরুন মিত্র সোমবার (১৯ অক্টোবর) বরিশাল জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
জানা গেছে, ২০১৯ সালে বরুণ মিত্র মিত্র উজিরপুর সার্বজনিন কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরসংলগ্ন ৪ শতক জমি কিনে সেখানে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। ভবনের একাংশ ভাড়া দিয়ে অপর অংশ মন্দিরের ব্যবহারের জন্য দান করেন। প্রতি বছরের বার্ষিক কীর্তন উপলক্ষে মন্দির কর্তৃপক্ষ ভবনের ওই অংশ ব্যবহার করে আসছে।
বরুণ মিত্র জানান, ২০২৪ সালের শুরুতে পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কারণে তিনি বরিশাল নগরীতে বসবাস শুরু করেন। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নুরুজ্জামান খান দলবল নিয়ে তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেন। পরে ভাড়াটিয়াদের মারধর করে বের করে দিয়ে বাড়িটি দখলে নেন।
বরুণ মিত্র আরো বলেন, তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে উজিরপুর সার্বজনীন কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরের সভাপতি। মন্দিরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আগত ভক্তদের সুবিধার্থে ভবনের একটি অংশ ব্যবহারের জন্য তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ করেছিলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। উপজেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। বরং অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন।
বরুণ মিত্র আরো বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত আবেদন করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বরং তালবাহানা করা হচ্ছে। জমির দলিল, বিএস পর্চা ও খাজনাসহ সব কাগজপত্র তার নামে থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের ভূমিকা তাকে হতাশ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কলেজ অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান বলেন, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির বৈধ ক্রেতা বরুণ মিত্র। একই খতিয়ানের ৮২ শতক জমি ১২টি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে রয়েছে। ৫ আগস্টের অস্থিরতার সুযোগে নুরুজ্জামান খান বাড়িটি দখলে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিজানুর রহমানের দাবি, জবরদখলের পরও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া উদ্বেগজনক। তার ভাষ্য, নুরুজ্জামান খানের কর্মকাণ্ডে স্থানীয় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
উজিরপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রোকনুজ্জামান টুলু বলেন, বরুণ মিত্রের বাড়ি অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে। দলের নাম ব্যবহার করে এমন কর্মকাণ্ডে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এতে কিছু নেতার উৎসাহও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোকনুজ্জামান টুলু জানান, বাড়ি ও মন্দিরের জমি দখলের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
তার অভিযোগ, নুরুজ্জামান খান এলাকার চিহ্নিত ভূমিদস্যু। এর আগে উজিরপুর মহিলা কলেজের জমি দখলের চেষ্টা করেছিলেন। এখন মন্দির স্থাপনায় ‘খান বাড়ি’ লিখে রেখেছেন। প্রকৃত মালিকদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে নুরুজ্জামান খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ভূক্তভোগী বরুন মিত্র অভিযোগ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু,জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান এবং জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার তার বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলমুক্ত করার নির্দেশ দিলেও অজ্ঞাত কারনে দখলমুক্ত করতে উজিরপুরের ইউএনও ও ওসি বিভিন্ন অজুহাতে তালবাহানা করছেন।
উজিরপুর মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, তার জানামতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাড়িটি দখল হয়। জমি নিয়ে আদালতে মামলা থাকায় পুলিশের এখতিয়ার সীমিত।
তিনি আরো বলেন, নতুন অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে অভিযোগকারীকে পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলী সুজা বলেন, বরুণ মিত্র অনেক আগেই বাড়ি দখলের অভিযোগ করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যে মতভেদ থাকায় দখলমুক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে দুই বছরের অধিক সময়েও বরুন মিত্রের বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলমুক্ত না হওয়ায় স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সচেতন মহলের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অবিলম্বে ওই বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।