• সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন
Headline
রাজধানীতে ফিটনেসবিহীন ও পরিবেশ দূষণকারী বাসের বিরুদ্ধে বিআরটিএর নিয়মিত অভিযান, কঠোর আইনগত ব্যবস্থা চলমান বানারীপাড়ায় ৩টি চাঁদাবাজিসহ ৯ মামলার আসামি যুবদল নেতা ওয়াসিম মৃধা গ্রেফতার বানারীপাড়ায় বাল্কহেডের ধাক্কায় ব্রিজ ভেঙ্গে খালে :জনদুর্ভোগ জনজাগরণ পত্রিকার সম্পাদক প্রকাশক ও মিরপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শিহাব উদ্দিন জন্মদিন পালিত বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে বরগুনার সেই মিন্নি কীর্তনখোলা নদীতে নৌ-তরী ‘কুইন অফ উলানিয়া’ উদ্বোধণ আইজিপির সঙ্গে জাতিসংঘ বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার সৌজন্য সাক্ষাৎ ছেলেকে বিমানে উঠিয়ে দিয়ে স্টোক করে বাবার মৃত্যু বরিশালে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা মুন্না আটক বরিশালে ছয়লেন মহাসড়কের দাবিতে তিন কিলোমিটারজুড়ে মানববন্ধন

আমি বড় হয়ে চাকরি করতে চাই, বাবা-মাকে নিয়ে ডাঙ্গায় ঘরে থাকতে চাই”

রাহাদ সুমন / ২৬০ Time View
Update : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

সাত বছরের ছোট্ট জান্নাতের শৈশব কেটেছে নদী আর নৌকার মাঝেই। জন্মের পর থেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে নৌকায় মাছ শিকারে যাওয়া তার নিত্যদিনের অভ্যাস। পড়াশোনা কী-তা জানারও সুযোগ হয়নি কখনও। কিন্তু মাত্র চার মাসেই বদলে গেছে তার জীবনের ভাবনা।

এখন জান্নাত নিজের নাম-ঠিকানা লিখতে পারে, ছড়া-কবিতা শিখেছে, বাংলা-ইংরেজি বর্ণ ও আরবি হরফও চিনতে পারে। শুধু তাই নয়, ছোট্ট এই শিশুর চোখে এখন নতুন স্বপ্ন-বড় হয়ে চাকরি করার।
কথা হয় মান্তা সম্প্রদায়ের শিশু জান্নাতের সঙ্গে। সে বলে, আমি বড় হয়ে চাকরি করতে চাই। বাবা-মাকে নিয়ে ডাঙ্গায় ঘরে থাকতে চাই। আর নৌকায় মাছ শিকারে যেতে চাই না।

শুধু জান্নাত নয়, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ ফেরিঘাট এলাকায় দুই তরুণীর উদ্যোগে এখন প্রায় ৫০ জন মান্তা শিশু শিক্ষার আলো দেখতে শুরু করেছে। কেউ শিখছে বর্ণমালা, কেউ সংখ্যা গোনা, আবার কেউ আঁকছে নিজের ভবিষ্যতের নতুন স্বপ্ন।

আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে বিকেলের শেষ আলোয় খোলা আকাশের নিচে বসে চলে এই ব্যতিক্রমী পাঠশালা। ছোট ছোট শিশুদের হাতে খাতা-পেন্সিল তুলে দিয়ে তাদের অক্ষরজ্ঞান শেখাচ্ছেন দুই বোন মুন্নি আক্তার ও মিতু আক্তার।
নদীপাড়ের লোহালিয়া গ্রামের আলতাফ হোসেন হাওলাদারের দুই মেয়ে নিজেদের বাড়ির আঙিনাকেই বানিয়েছেন ছোট্ট এক বিদ্যালয়।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে প্রতিদিন বিকেলে দুই ঘণ্টা করে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের পড়াচ্ছেন তারা। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন শিশু সেখানে অংশ নেয়।

কথা হয় মান্তা পরিবারের সদস্য পারভীন বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, আমার এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়মিত নদীপাড়ের ওই স্কুলে যায়। আমরা জীবিকার জন্য সারাদিন নদীতেই থাকি। মাছ ধরে বিক্রি করেই সংসার চলে। আমরাও পড়াশোনা করিনি, ছেলে-মেয়েদেরও পড়াশোনা করানো হয় না। মুন্নি আপা ওদের ডেকে পড়াশোনা শেখায়। প্রথমে যেতে না চাইলেও এখন প্রতিদিন বিকেলে বই-খাতা নিয়ে পড়তে যায় ওরা। আমরা চাই নদীর পাড়ে একটা স্কুল হোক। আমাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে পড়াশোনা করবে। আমরা চাই না আমাদের মতো ওদের জীবনও নদীতেই কাটুক।

স্থানীয়রা জানান, আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে প্রায় ৭০টি মান্তা পরিবার অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। কেউ বাঁশ ও পলিথিনের ছোট ঘরে থাকেন, আবার কেউ নৌকাকেই বানিয়েছেন স্থায়ী ঠিকানা। নদীকেন্দ্রিক জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এসব পরিবারের অধিকাংশ অভিভাবকই নিরক্ষর। ফলে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর বিষয়ে সচেতনতা খুবই কম। এসব পরিবারের শিশুরা ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরা কিংবা পরিবারের কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা থেকেই উদ্যোগ নেন মুন্নি ও মিতু। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তারা শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার কাজ শুরু করেন। ছোট পরিসরের সেই উদ্যোগ ধীরে ধীরে এলাকায় প্রশংসা কুড়াতে শুরু করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে পাঠশালাটি পরিদর্শনে যান বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা। তিনি শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন, পাঠদান কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং দুই বোনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
ইউএনও আসমা উল হুসনা বলেন, শিক্ষাবঞ্চিত মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পার্শ্ববর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের ভর্তি ও নিয়মিত পাঠদানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সচেতন মহলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মুন্নি আক্তার ও মিতু আক্তারের এই মানবিক উদ্যোগ সমাজের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ।
মান্তা সম্প্রদায়ের সদস্য হেলেনা বেগম বলেন, আমাদের এখানে ৭০টি পরিবারে প্রায় দেড় শতাধিক শিশু আছে। দারিদ্র্য আর নদীর জীবনের কারণে তারা স্কুলে যেতে পারে না। এখন অন্তত কিছু শিশু লেখাপড়া শেখার সুযোগ পাচ্ছে।
উদ্যোক্তা মুন্নি আক্তার জানান, এই শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়া এবং বিদ্যালয়মুখী করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছা আছে। এবছরের শুরুর দিকে ঢাকা থেকে বাড়িতে এসে দেখি মান্তা পরিবারের বাচ্চাগুলো আমাদের বাড়ির আঙিনায় খেলাধুলা করে, আবার নৌকায় মাছ ধরে বেড়ায়। তখন মনে হলো, এরাও সমাজের অংশ-এদেরও পড়াশোনা করা দরকার।

তিনি বলেন, প্রথমে তাদের বাবা-মাকে পড়াশোনার গুরুত্ব বুঝিয়ে বলি। শুরুতে তারা রাজি হয়নি। পরে দুই-চারজন শিশুকে নিয়ে শুরু করি। ধীরে ধীরে বাচ্চারা আসতে শুরু করে। এখন প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ জন প্রতিদিন আসে। ওদের মেধা থাকলেও কাজে লাগানোর সুযোগ পায় না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের চেয়ে মান্তা শিশুদের মনে রাখার ক্ষমতা বেশি। পরিবেশ ও তদারকি পেলে ওরা অনেক ভালো করবে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল হোসেন পুতুল বলেন, মান্তা সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা আমাদের ভোটার। তাদের শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিনের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন। টিনের ব্যবস্থা হলে আমরা একটি স্কুলঘর তুলে দেব।

নদীর তীরে ছোট্ট সেই খোলা পাঠশালায় এখন শুধু বর্ণমালা শেখানো হয় না, জাগিয়ে তোলা হয় নতুন জীবনের স্বপ্নও। বছরের পর বছর যেখানে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি, সেখানে দুই বোনের এই উদ্যোগ বদলে যাওয়ার এক নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা