• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৪ অপরাহ্ন

ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা, পদ্মায় অন্য চিত্র

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

১৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আরিচা ফেরিঘাট থেকে ‘বাঘমামা’ লঞ্চ রওনা হলো। আমাদের গন্তব্য পাবনার নাজিরহাট। পদ্মা নদীর উজান ঠেলে যেতে হবে। পলি-বালু থাকায় পানি ঘোলাটে। বর্ষার শেষ ভাগ হলেও পদ্মার স্রোত এখনো বেশ তীব্র। পদ্মার বুকে চর জাগতে শুরু করেছে।১৭ অক্টোবর বিকেলে বোটে উঠেছি। নদীর শুশুক নিয়ে আমাদের গবেষণা প্রকল্পের দ্বিতীয় বছরের কাজ শুরু হলো এ মাসের শুরুতে। আমাদের শুশুক জরিপ দল ১১ অক্টোবর খুলনার রূপসা নদী থেকে রওনা দিয়ে আরিচার পদ্মায় এসেছে ১৭ অক্টোবর। পদ্মা-যমুনার মিলনস্থল শিবালয়ের নেহালপুর গ্রামের পাশে আমাদের বোট নোঙর করা। সেখানেই রাত কাটালাম।মাছের রাজা ইলিশ কেমন করে বড় হয়ে রুপালি হবে, সেই সময় ও সুযোগ কি আমরা নিশ্চিত করতে পারছি? এ সময়ে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ। তবু পদ্মায় চলছে ইলিশের আহরণ। ১৯ অক্টোবর পাবনার নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাট বাজারেভোরবেলায় আরিচা ফেরিঘাটে মাছের আড়ত বসে। নানা জাতের মাছ এসেছে আজ (১৮ অক্টোবর)। বেশির ভাগ পদ্মা নদীর মাছ। বড় আকারের চিতল, পাঙাস থেকে শুরু করে ছোট আকারের সুস্বাদু পিয়ালি কিংবা পাবদা মাছও আছে। বিশাল আকারের বাগাড় উঠেছে একটি। আমাদের জরিপে ৩৬ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেল। এর সবই পদ্মার মাছ। আড়তের মালিকেরা উঁচুগলায় মাছের দর হাঁকছেন।জরিপের সময় হঠাৎ চোখ আটকে গেল মাছের একটি খাঁড়ির পাশে। দক্ষিণ আমেরিকার সাকার ফিশ আরিচার মাছের আড়তে। দেখে চমকে উঠলাম। পদ্মা নদীতেও এসে গেছে!অক্টোবরের প্রায় পুরো সময়ই (৮ অক্টোবর–২৯ অক্টোবর) ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ। ডিম ছাড়ার জন্য এ সময় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ফলে আড়তে ইলিশ নেই একটিও। আড়তের ছোট বরফকলটিও বন্ধ। দেখে ভালো লাগল। কয়েকজন দোকানি জানান, আড়তে এ মাসে ইলিশ আর উঠবে না, প্রশাসন বেশ নজরদারি করছে। আশাজাগানিয়া ব্যাপার। ইলিশ এবার রুপালি হওয়ার সুযোগ পাবে নিশ্চয়ই!রাতে পদ্মার চেহারায় বড় পরিবর্তন আসে। সন্ধ্যা থেকেই স্রোতস্বিনী পদ্মার জলে জেলেদের সমাগম বাড়তে থাকে। ইলিশ ধরার ফাঁস জালে ভরে ওঠে পদ্মার বুক। স্পিডবোটে মাঝেমধ্যে টহল দল আসে, সে সময় সটকে পড়েন জেলেরা। আবার ফিরে আসেন ফেলে রাখা জালের পাশে। সারা রাত চলে ইলিশ শিকার। ফজরের আজানের পর মাছ নিয়ে একে একে জেলেরা আসতে থাকেন শিবালয়ের নেহালপুর ও তেউতা গ্রামের আশপাশের নদীর পাড়ে। পাড়ের বিভিন্ন পয়েন্টে ইলিশ বিক্রি করে দেন জেলেরা। জরিপের সময় হঠাৎ চোখ আটকে গেল মাছের একটি খাঁড়ির পাশে। দক্ষিণ আমেরিকার সাকার ফিশ আরিচার মাছের আড়তে। দেখে চমকে উঠলাম। পদ্মা নদীতেও এসে গেছে!বড় ইলিশের পেটে ডিম

আমাদের বোট চলছে পদ্মায়, রাজবাড়ীর পাশ দিয়ে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে পদ্মা নদীর দক্ষিণ পাড়ে চরভরাট গ্রাম। ছোট খেয়াঘাট, পাশেই মাছের বাজার। জেলেরা কেউ পাড়ে নোঙর করা মাছের নৌকায়, কেউ কেউ নদীর পাড়ে সদ্য তোলা জাল ঠিকঠাক করছেন। অধিকাংশই ইলিশের জাল। বড় ফাঁসের দু-একটি সুতার জাল আছে। ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট নৌকায় জেলেরা ইলিশ ধরেন পদ্মায়।বেশির ভাগই বাচ্চা ইলিশ, পাঁচ-ছয় ইঞ্চির মতো লম্বা। দু–একটির দেখা মিলল ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের। বড় ইলিশের পেটে ডিম। গড়পড়তা এই ইলিশের প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।চরভরাট ঘাটে নামলাম জেলেদের সঙ্গে কথা বলতে। এরই মধ্যে দুপুর ১২টা বেজে গেছে। ভরদুপুর, ফলে রোদের তীব্রতা বেশ। ভোরের তুলনায় দিনের বেলায় জেলেদের উপস্থিতি কম। দু–একটি নৌকা এসে ভিড়ছে ঘাটে। ব্যাপারীরা টুকটাক দরদাম করে জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে জমা করছেন কলাপাতায় ঢাকা ঝুড়িতে। বেশির ভাগই বাচ্চা ইলিশ, পাঁচ-ছয় ইঞ্চির মতো লম্বা। দু–একটির দেখা মিলল ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের। বড় ইলিশের পেটে ডিম। গড়পড়তা এই ইলিশের প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।ইলিশের জন্য জেলেরা যে জাল ব্যবহার করেন, তার সবই ‘কারেন্ট’ জাল। তিন আকারের ফাঁসের কারেন্ট জাল একটির ওপর আরেকটি রেখে ওপরে-নিচে জালগুলো বেঁধে নিয়েছেন জেলেরা। সবচেয়ে ছোটটি এক ইঞ্চি, এরপর দেড় ইঞ্চি; আর বড়টি দুই ইঞ্চি ফাঁসের জাল। এই তিন স্তরের ফাঁসের জাল ভেদ করে মা কিংবা পোনা ইলিশ কেউই বাঁচতে পারছে না। এই কারেন্ট জাল নাকি আমাদের দেশে নিষিদ্ধ!চরভরাট গ্রামের তরুণ জেলে হোসেন মিয়া। খালি গা, গলায় গামছা, আমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছেন। গত রাতে ইলিশ কেমন পড়েছে জিজ্ঞেস করতেই হোসেন মিয়ার চোখেমুখে নেতিবাচক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল, ‘ক্যাল রাইতে মাত্র আড়াই কেজি ছোট ইলিশ পাইচিলাম।’ পদ্মায় ইলিশ নাই কেন? ‘ছার, জানি না, মনে হয় ভাটি থাইক্কা কোনো ইলিশ এদিকে আইতে পারে না। ওই দিকে জাল আরও বেশি।’মাছের রাজা ইলিশ কেমন করে বড় হয়ে রুপালি হবে, সেই সময় ও সুযোগ কি আমরা নিশ্চিত করতে পারছি? এম এ আজিজ, অধ্যাপক প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা