• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন

কবি জীবনানন্দের গদ্যভাষা

Reporter Name / ১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর জীবনানন্দ দাশের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর গদ্যভাষা নিয়ে লেখেন ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত এ লেখা এত দিন শুধু ছাপা কাগজের পাতাজুড়েই ছিল, আজ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।আজ সম্ভবত বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে নিঃসংকোচে একমত হতে আর কারও আপত্তি নেই যে কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র কাব্যভাষা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু তাঁর গদ্যভাষারীতিও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তাঁর প্রবন্ধগুলোর বাক্যগঠনরীতি সমসাময়িককালে সুপরিচিত ছিল না। এমনকি মনোযোগী পাঠকের কাছেও তা জটিল প্রতীয়মান হতে পারে।জীবনানন্দ দাশের প্রাবন্ধিক পরিচয় অদ্যাবধি বিশেষ কোনো মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়নি। তবে তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ-আলোচনা লিখেছিলেন, যার প্রতিটি অত্যন্ত মৌলিক চিন্তাভাবনার স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর প্রবন্ধের সংকলন ‘কবিতার কথা’ বেরিয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর—১৩৬২ বঙ্গাব্দে। এতে তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত ১৫টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধগুলো বহুল পঠিত। এই বিখ্যাত ১৫টি প্রবন্ধের বাইরেও জীবনানন্দের আরও কিছু প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সমালোচনা রয়েছে। এই রচনাসমষ্টির সংখ্যা খুব বেশি নয়। হিসাব করলে দেখা যায়, তাঁর সাহিত্য-সমাজ-শিক্ষাবিষয়ক রচনার সংখ্যা ৩০, গ্রন্থভূমিকা ও গ্রন্থালোচনা–জাতীয় রচনার সংখ্যা ৯, স্মৃতিতর্পণমূলক রচনার সংখ্যা ৩ এবং বিবিধ প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংখ্যা ৭। তদুপরি আরও সাতটি খসড়া প্রবন্ধের হদিস করা গেছে। অনুমিত হয়, অপুনরুদ্ধারকৃত প্রবন্ধের সংখ্যা এখন আর বেশি নেই।বুদ্ধদেব বসু ‘কবিতা’ পত্রিকার একটি প্রবন্ধ সংখ্যার (১৩৪৫, বৈশাখ) পরিকল্পনা করেছিলেন মূলত কবিদের গদ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। এরই সূত্রে জীবনানন্দ তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, যার নাম ‘কবিতার কথা’। এ প্রবন্ধের শুরু এভাবে—‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি-কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়; নানা রকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।’প্রারম্ভিক বাক্যটি হ্রস্ব হলেও অব্যবহিত পরেই তিনি দীর্ঘ বাক্যের ঘন বুনোট গড়ে তুলেছেন। ‘এবং’, ‘ও’ ইত্যাদি অন্বয়মূলক পদ এবং ‘কমা’, ‘সেমিকোলন’, ‘ড্যাশ’ প্রভৃতি যতিচিহ্নের সমম্বয়ে গড়ে উঠেছে এমন একটি গদ্যভাষা, যার সঙ্গে সমকালীন বাঙালি লেখক-পাঠকের আদৌ পরিচয় ছিল না।আঠারো শতকে বাংলা গদ্যের বিকাশ সূচিত হয়েছিল একটি সরল কাঠামো নিয়ে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বাল্মীকির জয়’–এর আলোচনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুরু করেছিলেন এভাবে: ‘বঙ্গদর্শনে যে সকল প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, পুনর্মুদ্রিত হইলে তাহা বঙ্গদর্শনে সমালোচিত হইয়া থাকে না। “বাল্মীকির জয়” কিয়দংশে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল, কিন্তু গ্রন্থের অধিকাংশই বঙ্গদর্শনে বাহির হয় নাই।’আঠারো শতকে বাংলা গদ্যের বিকাশ সূচিত হয়েছিল একটি সরল কাঠামো নিয়ে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বাল্মীকির জয়’–এর আলোচনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুরু করেছিলেন এভাবে, ‘বঙ্গদর্শনে যে সকল প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, পুনর্মুদ্রিত হইলে তাহা বঙ্গদর্শনে সমালোচিত হইয়া থাকে না। “বাল্মীকির জয়” কিয়দংশে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল, কিন্তু গ্রন্থের অধিকাংশই বঙ্গদর্শনে বাহির হয় নাই। উহার যে অংশ প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহাও বিশেষরূপে পরিবর্তিত হইয়া পুনর্মুদ্রিত হইয়াছে। এ অবস্থায় আমরা সমালোচ্য গ্রন্থ বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না। অতএব পাঠক যদি অনুমতি করেন, তবে ইহার সমালোচনায় প্রবৃত্ত হই। সম্পাদকের অনুমতি পাইয়াছি।’—বাক্যের দৈর্ঘ্য সীমিত। সীমিত দৈর্ঘ্যের বাক্য ধারণ করেছে একেকটি সাধারণ বক্তব্য। বাক্যপ্রকরণের এই অবক্র চারিত্র্য প্রমথ চৌধুরীর রচনাতেও অব্যাহত থেকেছে।প্রমথ চৌধুরী বাংলা গদ্যকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরোয়া’র আলোচনা থেকে প্রমথ চৌধুরীর গদ্যরীতির সুস্পষ্ট পরিচয় মেলে। তিনি লিখেছেন, ‘শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ঘরোয়া” পড়লুম। চমত্কার বই। ঘরোয়া মানে ঠাকুর পরিবারের ঘরের কথা।…অবনীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র এবং স্বগুণে স্বনামধন্য, সুতরাং তাঁর কোনও পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। তিনি চিত্রবিদ্যায় একজন আর্টিস্ট বলে দেশে–বিদেশে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জ্জন করেছেন। কিন্তু এ পুস্তকে তিনি নিজের কৃতিত্ব বিষয়ে কোনও কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি ঠাকুর পরিবারের ঘরোয়া কথা বলেছেন। পূর্ব্বে বলেছি, এ পুস্তক ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস নয়, তাই বলে উপন্যাসও নয়।’ এ গদ্যকাঠামোর চারিত্র্য ঋজু ও প্রাঞ্জল, যদিও এর প্রকাশক্ষমতাকে খাটো করে দেখার কারণ নেই।পরিবারের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশ‘পরিচয়’–এর কার্তিক ১৩৩৮ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগদীশ গুপ্তর ‘লঘু-গুরু’ উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। আলোচনার বিস্তারে রবীন্দ্রনাথ কেবল ‘লঘু-গুরু’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, সাহিত্যের মানমর্যাদা নিয়েও দু-চারটি কথা বলেছেন, ‘সাহিত্যে সম্মানের অধিকার বহির্নির্দিষ্ট শ্রেণী নিয়ে নয়, অন্তর্নিহিত চরিত্র নিয়ে। অর্থাৎ, পৈতে নিয়ে নয়, গুণ নিয়ে। আধুনিক একদল লেখক পণ করেছেন তাঁরা পুরাতনের অনুবৃত্তি করবেন না। কোনোকালেই অনুবৃত্তি করাটা ভালো নয়, এ কথা মানতেই হবে। নরসংহিতাসম্মত ফোঁটা—তিলকটা, আধুনিকতাও গতানুগতিক হয়ে ওঠে। সেটার অনুবৃত্তিও দুর্বলতা। চন্দনের তিলক যখন চলতি ছিল, তখন অধিকাংশ লেখা চন্দনের তিলকধারী হয়ে সাহিত্যে মান পেতে চাইত। পঙ্কের তিলকই যদি সাহিত্যসমাজে চলতি হয়ে ওঠে, তা হলে পঙ্কের বাজারও দেখতে দেখতে চড়ে যায়।’ বলার অপেক্ষা রাখে না যে রবীন্দ্রগদ্য মননশীলতায় ঋদ্ধ; তথাপি তাঁর ভাষার গাঁথুনিতে তেমন কোনো জটিলতা পরিদৃষ্ট হয় না। রবীন্দ্রনাথ স্বীয় চিন্তাচেতনাকে বোধগম্য করে প্রকাশ করার সুললিত একটি ভঙ্গি বেছে নিয়েছিলেন।পত্রপত্রিকার পাতা ঘেঁটে দেখা যায়, সমসাময়িককালে মোহিতলাল মজুমদার তাঁর গদ্যে জটিল বাক্যরীতিকে অবলম্বন করেছিলেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসটির আলোচনায় এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ মেলে। এর পক্ষে দীর্ঘ উদ্ধৃতির বিকল্প নেই। এ আলোচনায় মোহিতলাল লিখেছেন, ‘এই যে তারাশঙ্কর, ইনিই যখন জীবনের শিল্পরূপ নির্মাণ করেন, যেমন তাঁহার গল্পগুলিতে করিয়াছেন, তখন যে তাহাতে একটা সম্পূর্ণ নূতন ধরনের রসসৃষ্টি হইবে, ইহাই তো স্বাভাবিক। সে রস বাস্তবের রসই বটে, কিন্তু তাহার অন্তরালে একটা নির্মম অনাসক্ত তান্ত্রিক-দৃষ্টি আছে; সেই দৃষ্টি যখন নর-নারীর হৃদয়মধ্যেও উঁকি দিয়াছে তখন তাহা খাঁটি আর্টিস্টের নির্মমতায় পরিণত হইয়া, সর্বসংস্কারমুক্তির যে-আনন্দ সেই আনন্দের রস-সৃষ্টি করিয়াছে। ইহাই তারাশঙ্করের আর্ট, আমি তাহাকে একরূপ তান্ত্রিক রস-প্রেরণা বলিয়াছি; ইহার স্থূল দৃষ্টান্ত হিসাবে, তাঁহার গল্পে নর-নারীর প্রেম ও প্রেম-বিকারগুলি স্মরণ করিয়া বলি, সেই প্রেমে নীতি-দুর্নীতির সংস্কার নাই, আছে কেবল প্রত্যেক চরিত্রে সেই প্রবৃত্তির রক্তগত সংস্কার।’কবি জীবনানন্দ দাশলক্ষ করা যেতে পারে, মোহিতলাল একটি বাক্যের ভেতরে একাধিক অণুবাক্যকে ধারণ করার প্রয়াস পেয়েছেন। ফলে বাক্য কেবল দীর্ঘায়িত হয়নি, তার গঠনে জটিলতা অনুপ্রবেশ করেছে। তিনি বিশেষ করে মূল বাক্যের জরায়ুতে যতিচিহ্ন-চিহ্নিত নতুন বাক্য জুড়ে দিয়ে বক্তব্যকে সংহত রূপ দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ পাদে বা বিশ শতকের প্রথমাংশে কার হাতে বাংলা গদ্যসাহিত্যে প্রথম এরূপ বাক্যকাঠামো প্রবর্তিত হয়েছিল তা নিরূপণ করার অপেক্ষা রাখে। তবে নিঃসংকোচে বলা চলে যে এর ফলে বাংলা গদ্যের আঙ্গিক ও স্বাদ বহুলাংশে বদলে গিয়েছিল। অন্যদিকে গদ্য লাভ করেছিল বক্তব্য প্রকাশের গভীরতর শক্তি ও বিস্তৃত অবকাশ। জীবনানন্দের গদ্য এই ঘরানারই উচ্চতর বিকাশ। তাঁর গদ্যভাষাতেও লক্ষ করা যায় অনুরূপ দীর্ঘ বাক্যে বহুতর বক্তব্য ধারণের প্রয়াস। অত্যুক্তি হবে না যে এভাবেই বাংলায় প্রবন্ধের যথোপযুক্ত একটি গদ্যভাষার প্রবর্তনা হয়েছিল। কিন্তু জীবনানন্দের রূপবন্ধ ও জটিলতা কেবল বাক্যপ্রকরণ রীতির মধ্যে সূত্রাবদ্ধ নয়, তাঁর শব্দ ব্যবহারের রীতিও অনন্যসাধারণ। শব্দচয়নে তিনি অক্লেশে তত্সম শব্দের আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর ব্যবহৃত সমাসবদ্ধ পদগুলো গদ্যের প্রকাশক্ষমতাকে বিস্তৃত করেছে।জীবনানন্দ দাশ একই বাক্যে ধারণ করেছেন বক্তব্যের নিহিতার্থ ও তার শর্ত; একই বাক্যে রয়েছে বক্তব্য ও তার বিশেষায়িত টীকা। একটি বাক্যের একদিকে রয়েছে মূল বক্তব্য, অন্যদিকে রয়েছে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। পূর্ণ বাক্য শেষে পূর্ণ যতির পরিবর্তে জীবনানন্দ দাশ অর্ধ-যতি ব্যবহার করে যুক্ত করেছেন আরেকটি পূর্ণ বাক্য; ফলে বাক্যের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, অনুপ্রবেশ করেছে জটিলতা। সন্দেহ নেই এর ফলে ভাষার নির্মলতা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে তাঁর গদ্যভঙ্গিতে প্রোথিত হয়েছে সুললিত দার্ঢ্য যা গভীর ও সূক্ষ্ম চিন্তাসূত্রকে ধারণ করতে সক্ষম। এই গদ্যরীতির সঙ্গে ইউরোপীয় প্রবন্ধ সাহিত্যের গদ্যরীতির সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়।ভাষাচিন্তাও উপলব্ধির বাহন। চিন্তা ও উপলব্ধির গভীরতার ওপর নির্ভর করে ভাষার চারিত্র্য। নির্দ্বিধায় বলা চলে, জীবনানন্দ স্বীয় মননশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি স্বতন্ত্র গদ্যকাঠামো প্রণয়নে সমর্থ হয়েছিলেন। এ পর্যায়ে জীবনানন্দ থেকে আরেকটি উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। উদ্ধৃটি দীর্ঘ হলেও জীবনানন্দীয় গদ্যভঙ্গির অনেক বৈশিষ্ট্যই এতে অবধৃত ও পরিস্ফুট—‘…আমি বলতে চাই না যে কাব্যের সঙ্গে জীবনের কোনো সম্বন্ধ নেই; সম্বন্ধ রয়েছে, কিন্তু প্রসিদ্ধ প্রকটভাবে নেই। কবিতা ও জীবন একই জিনিসেরই দুই রকম উত্সারণ; জীবন বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি তার ভিতর বাস্তব নামে আমরা সাধারণত যা জানি তা রয়েছে, কিন্তু এই অসংলগ্ন অব্যবস্থিত জীবনের দিকে তাকিয়ে কবির কল্পনা-প্রতিভা কিংবা মানুষের ইমাজিনেশন সম্পূর্ণভাবে তৃপ্ত হয় না; কিন্তু কবিতা সৃষ্টি করে কবির বিবেক সান্ত্বনা পায়, তার কল্পনা-মনীষা শান্তি বোধ করে, পাঠকের ইমাজিনেশন তৃপ্তি পায়। কিন্তু সাধারণত বাস্তব বলতে আমরা যা বুঝি তার সম্পূর্ণ পুনর্গঠন তবুও কাব্যের ভিতর থাকে না; আমরা এক নতুন প্রদেশে প্রবেশ করেছি। পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে দিয়ে যদি এক নতুন জলের কল্পনা করা যায় কিংবা পৃথিবীর সমস্ত দীপ ছেড়ে দিয়ে এক নতুন প্রদীপের কল্পনা করা যায়, তাহলে পৃথিবীর এই দিন, রাত্রি, মানুষ ও তার আকাঙ্ক্ষা এবং সৃষ্টির সমস্ত ধুলো সমস্ত কঙ্কাল ও সমস্ত নক্ষত্রকে ছেড়ে দিয়ে এক নতুন ব্যবহারের কল্পনা করা যেতে পারে। যা কাব্য—অথচ জীবনের সঙ্গে যার গোপনীয় সুড়ঙ্গলালিত সম্পূর্ণ সম্বন্ধ; সম্বন্ধের ধূসরতা ও নূতনতা। সৃষ্টির ভিতর মাঝে মাঝে এমন শব্দ শোনা যায়, এমন বর্ণ দেখা যায়, এমন আঘ্রাণ পাওয়া যায়, এমন মানুষের বা এমন অমানবীয় সংঘাত লাভ করা যায় কিংবা প্রভূত বেদনার সঙ্গে পরিচয় হয় যে মনে হয় এই সমস্ত জিনিসই অনেক দিন থেকে প্রতিফলিত হয়ে কোথাও যেন ছিল; এবং ভঙ্গুর হয়ে নয়, সংহত হয়ে, আরও অনেক দিন পর্যন্ত, হয়তো মানুষের সভ্যতার শেষ জাফরান রৌদ্রলোক পর্যন্ত, কোথাও যেন রয়ে যাবে; এইসবের অপরূপ উদ্‌গীরণ ভিতর এসে হৃদয়ে অনুভূতির জন্ম হয়, নীহারিকা যেমন নক্ষত্রের আকার ধারণ করতে থাকে তেমনি বস্তু-সঙ্গতির প্রসব হতে থাকে যেন হৃদয়ের ভিতরে; এবং সেই প্রতিফলিত অনুচ্চারিত দেশ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে ওঠে যেন সুরের জন্ম হয়; এই বস্তু ও সুরের পরিণয় শুধু নয়, কোনো কোনো মানুষের কল্পনামনীষার ভিতর তাদের একাত্মতা ঘটে, কাব্য জন্ম লাভ করে।’ (‘কবিতার কথা’)জীবনানন্দ দাশ একই বাক্যে ধারণ করেছেন বক্তব্যের নিহিতার্থ ও তার শর্ত; একই বাক্যে রয়েছে বক্তব্য ও তার বিশেষায়িত টীকা। একটি বাক্যের একদিকে রয়েছে মূল বক্তব্য, অন্যদিকে রয়েছে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। পূর্ণ বাক্য শেষে পূর্ণ যতির পরিবর্তে জীবনানন্দ দাশ অর্ধযতি ব্যবহার করে যুক্ত করেছেন আরেকটি পূর্ণ বাক্য। ফলে বাক্যের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, অনুপ্রবেশ করেছে জটিলতা। সন্দেহ নেই এর ফলে ভাষার নির্মলতা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে তাঁর গদ্যভঙ্গিতে প্রোথিত হয়েছে সুললিত দার্ঢ্য, যা গভীর ও সূক্ষ্ম চিন্তাসূত্রকে ধারণ করতে সক্ষম। এই গদ্যরীতির সঙ্গে ইউরোপীয় প্রবন্ধ সাহিত্যের গদ্যরীতির সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়।জীবনানন্দ দাশতথাপি লক্ষণীয় যে জীবনানন্দ তাঁর গদ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাক্য-পদ-স্থাপনার রীতি অনুসরণ করেছেন। বস্তুত তার মূল অবদান একই বাক্যের কাঠামোতে যুক্তিসম্মত বিবিধ বাক্য, অণুবাক্য ও বাক্যাংশের সমাবেশ। ফলে ভাষার লৌকিক রীতি পরিত্যক্ত হয়েছে; প্রণীত হয়েছে এমন একটি বাক্যকাঠামো, যাতে একই বাক্যে একটি জটিল অথচ পূর্ণাঙ্গ চিন্তাসূত্র স্থান লাভ করেছে। লৌকিক ভাষায় বক্তব্য প্রকাশের যে পরমঙ্রা আমরা লক্ষ করি, জীবনানন্দের গদ্যভাষা তার বিপরীতে প্রবাহিত হয়েছে। লৌকিক ভাষার স্বভাবী শিথিলতা দূরীভূত করে জীবনানন্দ দাশ বাংলা গদ্যকে দিয়েছেন গভীর মননশীল বক্তব্য প্রকাশের অপরিমেয় শক্তি।জীবনানন্দের অধিকাংশ গদ্য রচনাই ফরমায়েশি। সাহিত্য, শিক্ষা, সমাজ—এই তিনটি পরিক্ষেত্রে জীবনানন্দ প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো লিখেছেন। তাঁর বিশিষ্ট প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম এ রকম—‘কবিতার কথা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’, ‘মাত্রাচেতনা’, ‘উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য’, ‘কবিতার আত্মা ও শরীর’, ‘কি হিসাবে কবিতা শাশ্বত’, ‘কবিতাপাঠ’, ‘দেশকাল ও কবিতা’, ‘সত্যবিশ্বাস ও কবিতা’, ‘রুচি, বিচার ও অন্যান্য কথা’, ‘কবিতার আলোচনা’, ‘আধুনিক কবিতা’, ‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’, ‘কেন লিখি’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘শরত্চন্দ্র’, ‘কঙ্কাবতী ও অন্যান্য কবিতা’, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’, ‘পৃথিবী ও সময়’, ‘যুক্তি, জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’, ‘অর্থনৈতিক দিক’, ‘শিক্ষা ও ইংরেজি’, ‘শিক্ষা-দীক্ষা-শিক্ষকতা’, ‘শিক্ষার কথা’, ‘শিক্ষা সাহিত্যে ইংরেজী’ ও ‘শিক্ষা-দীক্ষা’। বলা যায়, সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা নিয়ে জীবনানন্দ বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ উপহার দিয়েছেন। প্রতিটি রচনাই বহুমাত্রিক মৌলিক চিন্তাসূত্রের স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর গদ্যভাষাভঙ্গি চিন্তাসূত্রের এই বহুমাত্রিকতা ধারণে সহায়ক হয়েছে বলেই মনে হয়। স্বীকার্য যে শব্দ প্রয়োগের নৈপুণ্য ভাষাকে শিল্পসম্মত সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত করে। জীবনানন্দ দাশ এই অনুশীলনে যোগ করেছেন বাক্যগঠনরীতির সুচারু নিপুণতা। তবে তা কখনোই শূন্যগর্ভ বাক্চাতুর্যে পর্যবসিত হয়নি। জীবনানন্দের গদ্য গভীর অনুভূতির চৌকস প্রকাশ, যা বাংলা প্রবন্ধকে বৈশ্বিক অবস্থানে পৌঁছানোর পরিপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়ে গেছে।ব্রাসেলস, ১১ অক্টোবর ২০০৬


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা