
স্বরূপকাঠি থেকে:
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় উদ্ধার হওয়া গলাকাটা মাথাবিহীন লাশ ঘিরে সৃষ্টি হওয়া রহস্যের জট খুলে দিয়েছে পুলিশ । একটি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির হ্যান্ডবিলকে সূত্র ধরে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই লাশের পরিচয় শনাক্ত এবং জড়িতদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী । এ ঘটনায় নেছারাবাদ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মেহেদী হাসানের দক্ষতা ও দূরদর্শিতা ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছেন । কিভাবে ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে একটি চাঞ্চল্যকর হত্যার রহস্য, আসামী গ্রেফতার লাশের পরিচয় শনাক্ত করলো পুলিশ তা নিয়ে সাজানো এ প্রতিবেদন ।
সিসিটিভিতে ধরা পড়ে রহস্যের সূচনা:
ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে একটি সাদা মোটর সাইকেলে তিন যুবক ইটভাটায় প্রবেশ করে । তবে মাত্র ১২ মিনিট পর, অর্থাৎ ৩টা ২৭ মিনিটে, একই মোটর সাইকেলে বের হয়ে আসে দুইজন ।
ফুটেজে দেখা পোশাকের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া জুতো ও টি-শার্টের মিল খুঁজে পেয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয় ভেতরে প্রবেশ করা একজনই হত্যার শিকার ।
ঘটনাস্থল থেকেই শুরু তদন্ত:
গত ১৩ মার্চ বিকেলে উপজেলার সমুদয়কাঠি ইউনিয়নের সারেংকাঠি এলাকার একটি ইটভাটার পাশের নদীর তীর থেকে গলাকাটা মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয় । খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান ওসি মো. মেহেদী হাসান । পরে সিআইডি, পিবিআই ও র্যাবের সমন্বয়ে শুরু হয় যৌথ তদন্ত । গভীর রাত পর্যন্ত তদন্ত চালিয়ে একপর্যায়ে লাশ থানায় নেওয়া হয় । রাতেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জরুরি বৈঠকে বসে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন ওসি । তার নির্দেশে পুনরায় তল্লাশির সময় লাশের প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে উদ্ধার হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, একটি হ্যান্ডবিল ।
হ্যান্ডবিল ক্লু’তেই বদলে যায় তদন্তের গতি:
উদ্ধার হওয়া হ্যান্ডবিলটি ছিল যমুনা ইলেকট্রনিক্স কোম্পানির । এতে থাকা একটি মোবাইল নাম্বার তদন্তে নতুন মোড় এনে দেয় । ওই নাম্বারে যোগাযোগ করে জানা যায়, বরিশালের কাশির বাজার এলাকায় ওইদিন হ্যান্ডবিল বিতরণ করা হয়েছিল এবং সে সময় তোলা ১৫৪টি ছবি সংরক্ষণ করা ছিল ।
পুলিশ ছবিগুলো সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করে । এক পর্যায়ে “Malteser” লেখা টি-শার্ট পরা এক যুবকের সঙ্গে লাশের পোশাকের মিল পাওয়া যায় ।
পরিচয় মিললো গোপাল চন্দ্র দাসের:
ছবির সূত্র ধরে বরিশালের কাশিপুর এলাকায় গিয়ে পুলিশ নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করে । তার নাম গোপাল চন্দ্র দাস (৪০)। তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জীবনযাপন করছিলেন বলে জানা যায় । পরে স্বজনরা এসে লাশটি শনাক্ত করেন ।
দ্রুত অভিযানে গ্রেফতার ২:
ঘটনার সূত্র ধরে ওই রাতেই বরিশাল এয়ারপোর্ট থানা এলাকা থেকে তরিকুল ইসলাম সম্রাট (২৯)কে গ্রেফতার করা হয় । পরবর্তীতে র্যাব-৮ এর সহায়তায় অপর আসামি আবেদীন মাঝি ওরফে রাজু (৪২)কেও আটক করা হয় ।
হত্যার পেছনে নারী ও মাদক দ্বন্দ্ব:
পুলিশ জানায়, প্রধান আসামি তরিকুল ইসলাম সম্রাটের সঙ্গে নিহত গোপালের নারী সংক্রান্ত বিরোধ ছিল । অন্যদিকে, সহঅভিযুক্ত রাজুর সঙ্গে মাদক ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল । অভিযোগ রয়েছে, গোপাল তার কয়েকটি মাদকের চালান নষ্ট করে দেয়, যা হত্যার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।
হ্যান্ডবিলই ছিল টার্নিং পয়েন্ট” — ওসি:
ওসি মো. মেহেদী হাসান বলেনঃ মস্তকবিহীন লাশটি প্রথমে শনাক্ত করা কঠিন ছিল । তবে ঠান্ডা মাথায় তদন্ত চালিয়ে লাশের পকেটে পাওয়া একটি হ্যান্ডবিলকে সূত্র ধরে আমরা দ্রুত পরিচয় শনাক্ত ও আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হই ।”
প্রশংসায় ভাসছে পুলিশ:
মাত্র একটি হ্যান্ডবিলকে ক্লু হিসেবে ব্যবহার করে দ্রুত সময়ের মধ্যে এমন জটিল ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করায় পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছেন।
অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ ওসি মো. মেহেদী হাসান ।
Leave a Reply