• সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন

পাতা দিয়ে সুর তোলেন রাব্বানী, কোক স্টুডিও এনে দিয়েছে পরিচিতি

Reporter Name / ১৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

বিদ্যালয়ে তখন মধ্যাহ্নবিরতি চলছে। মাঠের একপাশে মেহগনিগাছের ছায়ায় গল্প-আড্ডায় মেতেছে শিক্ষার্থীরা। এমন সময় মাঠে ঢুকলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। তাঁকে দেখে এগিয়ে এলেন প্রধান শিক্ষক। কয়েকজন শিক্ষার্থীও এগিয়ে এসে কুশল বিনিময়ের পর আবদার জুড়ে দিল, ‘রাব্বানী স্যার, একটা গান শোনান।’আবদার ফেলতে পারলেন না গোলাম রাব্বানী (৫৬)। মেহগনিগাছ থেকে ছিঁড়ে নিলেন দুটি পাতা। একটির এক প্রান্ত সামান্য ভাঁজ করে ঠোঁটে চেপে ধরলেন। এরপর ফুঁ দিতেই ভেসে এল সুর, ‘আমরা করব জয়, আমরা করব জয় একদিন’। একে একে শোনালেন ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান’, ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়া’, ‘দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইয়ো না’।যেকোনো গাছের পাতা দিয়েই সুর বের করা সম্ভব। তবে আতা ও মেহগনিগাছের পাতায় তুলনামূলক ভালো সুর পাওয়া যায়।গত বৃহস্পতিবার দুপুরে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা শহরের আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন স্কুলে দেখা যায় এই দৃশ্য। কোনো বাঁশি নেই, নেই কোনো বাদ্যযন্ত্র। গাছের পাতার বাঁশি বানিয়ে তাতে ফুঁ দিয়েই একের পর এক গানের সুর তোলেন গোলাম রাব্বানী। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, আধুনিক গান, লোকগীতি কিংবা হিন্দি গান, প্রায় সব ধরনের গানই তাঁর পাতার বাঁশিতে প্রাণ পায়। ২০২৩ সালে কোক স্টুডিও বাংলার ‘দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইয়ো না’ গানে পাতার বাঁশি বাজিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি।গোলাম রাব্বানীর বাড়ি বোচাগঞ্জ উপজেলার রামদাসপাড়া এলাকায়। একসময় স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাতার বাঁশি বাজিয়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন। এখন টেলিভিশনের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে জনপ্রিয় সংগীত আয়োজন, নানা মাধ্যমে দেখা মিলছে তাঁর। বৃহস্পতিবার নিজের জীবনের নানা বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন তিনি।গোলাম রাব্বানীকে কাছে পেলেই চলে বাঁশি বাজানোর আবদার। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বোচাগঞ্জ উপজেলা কার্যালয়ের সামনেচার মাস পর প্রথম সুররাব্বানীর পাতার বাঁশির গল্পের শুরু ১৯৮২ সালে। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। একদিন বাড়ির পাশে রেললাইনের ধারে বড় ভাই শামীম আহমেদকে পাতার বাঁশি বাজাতে দেখে শেখার বায়না ধরেন। প্রথমে রাজি না হলেও একপর্যায়ে ভাই তাঁকে কৌশল শিখিয়ে দেন।প্রথম দিকে পাতা ঠোঁটে চেপে ফুঁ দিতেন রাব্বানী, শব্দ বের হতো না। বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এভাবে কেটে যায় প্রায় চার মাস। অবশেষে একদিন ফুঁ দিতেই বেরিয়ে আসে শব্দ। সেই শব্দই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সুর। পরবর্তী সময়ে হারমোনিয়াম ও তবলার প্রতিও আগ্রহ বাড়তে থাকে।রাব্বানী বলেন, ‘জেদের বশে কয়েক মাস চেষ্টা করে বাজানো শিখেছি। যখন শিখেছি, তখন সেটা শখ হয়ে গেছে। সেই শখই এখন জীবিকা।’ঢাকায় সুযোগছোটবেলা থেকেই এলাকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যেতেন রাব্বানী। ১৯৮৭ সালে মাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় বড় ভাইয়ের কাছে যান। একদিন ভাইয়ের বন্ধুরা তাঁকে বাড্ডার একটি ঘরোয়া আড্ডায় নিয়ে যান। সেখানে পাতার বাঁশিতে সুর তুলে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন তিনি।ওই আড্ডায় ছিলেন জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র একজন কর্মকর্তা। তাঁর মাধ্যমেই পরিচয় হয় অনুষ্ঠানটির পরিচালক হানিফ সংকেতের সঙ্গে। পরে ‘ইত্যাদি’তে পাতার বাঁশিতে ‘কলকল ছলছল নদী করে টলমল’ গানের সুর শোনান রাব্বানী। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘অল্পস্বল্প গল্প’, এটিএন বাংলার ‘কনকা কমেডিয়ান আওয়ার’ এবং ‘নেসক্যাফে গেট সেট রক’ অনুষ্ঠানে যন্ত্রশিল্পীদের একটি অনুষ্ঠানেও অংশ নেন। এভাবে স্থানীয় পরিসর ছাড়িয়ে তাঁর বাঁশির সুর পৌঁছে যায় বড় মঞ্চে।বাড়ির পাশে রাক্ষসিনী নদীর পাড়ে বসে পাতার বাঁশি বাজাচ্ছেন গোলাম রাব্বানী। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বোচাগঞ্জের রামদাসপাড়া এলাকায়কোক স্টুডিওতে নতুন পরিচিতিকোক স্টুডিও বাংলার ‘দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইয়ো না’ গানে পাতার বাঁশি বাজিয়ে নতুন করে দর্শক-শ্রোতার দৃষ্টি কাড়েন রাব্বানী। পরিচিত একজনের মাধ্যমে সংগীত পরিচালক ইমন চৌধুরীর নজরে আসেন তিনি। চেনা গানের সুর পাতার বাঁশিতে শুনে অনেকে বিস্মিত হন।পাতার বাঁশিতে ঠোঁটের অবস্থান, পাতার ভাঁজ ও ফুঁ দেওয়ার কৌশল—সবকিছুর সমন্বয় না হলে সুর ওঠে না। রাব্বানী বলেন, ‘যখন পাতায় সুর তুলি, তখন অনেকে কৌতূহল নিয়ে শোনেন, অবাক হন। অনেকে নিজে বাজানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু না পেরে বলেন, কাজটা খুব কঠিন। একটা অসাধ্য সাধন করেছি, এমন মনে হলে বেশ ভালো লাগে।’ তিনি জানান, যেকোনো গাছের পাতা দিয়েই সুর বের করা সম্ভব। তবে আতা ও মেহগনিগাছের পাতায় তুলনামূলক ভালো সুর পাওয়া যায়।শিক্ষার্থীরা পাতার বাঁশির সুর শুনতে জড়ো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বোচাগঞ্জের আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন স্কুলেশখ থেকে জীবিকাসংগীতের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও জীবনকে শুধু মঞ্চে বেঁধে রাখেননি রাব্বানী। ১৯৯৪ সালে সেতাবগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছেন। তাঁর এক কন্যাসন্তান আছে। স্ত্রী স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। জীবনের বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি করেছেন রাব্বানী। স্বাধীনভাবে কিছু করার ইচ্ছা থেকে বাড়ির পাশে গড়ে তুলেছেন নিজের আর্ট স্কুল। সেখানে শিশুদের ছবি আঁকা ও সুন্দর লেখার কলাকৌশল শেখান। পাশাপাশি গান ও কবিতা লেখেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পাতার বাঁশি বাজিয়ে আয়ও করেন।বোচাগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘মন খারাপ হলে চলে যাই রাব্বানীর আর্ট স্কুলে। সঙ্গে পাতা নিয়ে যাই। গান শুনি, আড্ডা দিই। গান নিয়ে অনেক আলাপও হয়।’আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুর আলম বলেন, তাঁদের স্কুলের পাশেই রাব্বানীর আর্ট স্কুল। টিফিনের সময় প্রায়ই শিক্ষার্থীদের আবদারে পাতার বাঁশি বাজিয়ে শোনান তিনি।পরিচিতি যতই বাড়ুক, রাব্বানী বদলাননি। স্কুলের মাঠ হোক বা টং দোকানের আড্ডা, শ্রোতা চাইলেই বেজে ওঠে তাঁর পাতার বাঁশি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা