বিসমিল্লাহ অর্থ ‘আল্লাহর নামে শুরু করছি’। কোনো কাজের শুরুতে এই বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে। তাঁর সাহায্য ও বরকত কামনা করে। তবে বিসমিল্লাহকে শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়, এর শিক্ষা আমাদের কাজ-কর্মেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত। কোরআন-হাদিসের আলোকে বিসমিল্লাহর ৭ শিক্ষা হলো—১. প্রতিটি কাজে আল্লাহর স্মরণমানুষ সাধারণত কাজ শুরু করে নিজের পরিকল্পনা ও সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বিসমিল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সামর্থ্য ও সুযোগ সবই আল্লাহর দান।আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১)ওহির প্রথম নির্দেশেই পড়ার কাজকে ‘প্রতিপালকের নামে’র সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এটি মানুষকে জ্ঞানচর্চাসহ কল্যাণকর কাজে আল্লাহকে স্মরণ করার শিক্ষা দেয়।মহাপ্লাবন শুরু হওয়ার পূর্বে নৌযানে ওঠার সময় নুহ (আ.) নিজের সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা এ নৌকায় আরোহণ করো, আল্লাহর নামেই এর চলা ও নোঙর করা।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৪১)অর্থাৎ যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ওপর নির্ভরতা থাকবে। শয়তান মানুষকে অন্যায় ও অবাধ্যতার দিকে আহ্বান করে। আল্লাহর নাম নেওয়ার অভ্যাস সেই প্ররোচনার বিরুদ্ধে মনকে সজাগ রাখবে।কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া, দায়িত্বে অবহেলা করা, কারও প্রাপ্য আটকে রাখা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করা এই আমানতেরই খেয়ানত। তাই বিসমিল্লাহর শিক্ষা হলো, আল্লাহর নাম নিয়ে যে কাজ শুরু হবে, তা যেন মানুষের অধিকার নষ্ট করার কারণ না হয়।২. বৈধ পথে চলাআল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করলেই কোনো কাজ বৈধ হয়ে যায় না। কাজটি ইসলামে বৈধ কি না, তা আগে দেখতে হবে। যেমন খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র, তা থেকে আহার করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)উপার্জনের ক্ষেত্রে এ কথা আরও বেশি জরুরি, কারণ জীবনযাপন ও ইবাদতের শুদ্ধতা এর ওপর অনেকটা নির্ভর করে। আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুলগণ, তোমরা পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো এবং সৎকাজ করো।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫১) তাই বিসমিল্লাহ বলে কাজ শুরু করার পাশাপাশি ব্যাবসা, চাকরি বা অন্য যে কোনো পেশায় সুদ, ঘুস, আত্মসাৎ ও প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকাও জরুরি। কারণ আল্লাহর নাম নিয়ে কি এমন কাজ শুরু করতে পারি, যা আল্লাহ করতে নিষেধ করেছেন?অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ কি বাধ্যতামূলক৩. আমানতদারি রক্ষা করা
আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করার পর সেই কাজ পরিপালনেও তাঁর বিধান মেনে চলাও জরুরি। এর অন্যতম দাবি হলো আমানত রক্ষা করা। কোরআনে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)আমানত বলতে শুধু গচ্ছিত সম্পদ বুঝিয়ে দেওয়া বোঝায় না। ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চাকরিজীবী কিংবা প্রতিষ্ঠানপ্রধান—প্রত্যেকের ওপর অর্পিত দায়িত্বও আমানত। কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া, দায়িত্বে অবহেলা করা, কারও প্রাপ্য আটকে রাখা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করা এই আমানতেরই খেয়ানত। তাই বিসমিল্লাহর শিক্ষা হলো, আল্লাহর নাম নিয়ে যে কাজ শুরু হবে, তা যেন মানুষের অধিকার নষ্ট করার কারণ না হয়।সুরা তালাক, আয়াত: ৩আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।৪. আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা
ইসলাম পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করে না। তবে নিজের যোগ্যতা ও উপকরণকেই চূড়ান্ত না ভেবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখায়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা এই ভরসারই বহিঃপ্রকাশ। তবে তাওয়াক্কুলের অর্থ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। বৈধ উপায়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করে ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত ভরসা।৫. আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশাবিসমিল্লাহর মধ্যে আল্লাহর দুটি গুণবাচক নাম আছে, আর-রহমান ও আর-রহিম। এ দুটি নাম আল্লাহর ব্যাপক ও বিশেষ রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি নিজের ওপর রহমত অবধারিত করে নিয়েছেন।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১২)এই প্রত্যাশা মুমিনকে হতাশা থেকে দূরে রাখবে। বিপদে সে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে এবং তাঁর অনুগ্রহের আশা ছাড়বে না। যে নিজে আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী, অন্যের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখানোও তার কর্তব্য।কেন ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হয়৬. পরিবারে আল্লাহর জিকিরের চর্চা
বিসমিল্লাহর অভ্যাস ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষারও অংশ। ছোটোবেলা থেকে সন্তানকে আল্লাহর নাম নিতে শেখালে তার দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর স্মরণ জায়গা করে নেবে। ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলেন, শিশুকালে খাবারের পাত্রে তাঁর হাত চারদিকে ঘুরছিল। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘হে বালক আল্লাহর নাম নাও, ডান হাতে খাও এবং তোমার নিকটবর্তী অংশ থেকে খাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৭৬)তবে শুধু মুখে বিসমিল্লাহ বলতে শেখানো যথেষ্ট নয়। সন্তানকে সত্যবাদিতা, হালাল-হারামের পার্থক্য, মানুষের অধিকার ও দায়িত্ব পালনের গুরুত্বও বোঝাতে হবে। বড়োদের আচরণ থেকেই শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে, তাই পরিবারের বড়োদেরও এসব মেনে চলতে হবে।বিসমিল্লাহ মুসলমানদের মুখে উচ্চারিত সবচেয়ে পরিচিত বাক্যগুলোর একটি। প্রতিবার এই বাক্য বলার সময় আমাদের মনে রাখা উচিত, আল্লাহর নামে শুরু করা কাজ যেন তাঁর নির্দেশের পরিপন্থী না হয়।৭. আল্লাহর বিধান সম্পর্কে সতর্কতা
আল্লাহর নাম নেওয়া ব্যক্তির জন্য তাঁর বিধান নিয়ে কথা বলাতেও সতর্ক হওয়া জরুরি। নিজের ইচ্ছা বা সমাজের প্রচলনের ভিত্তিতে কোনো কিছুকে হালাল বা হারাম বলা যায় না।আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মুখ থেকে সাধারণত যে মিথ্যা বের হয়ে আসে, তেমনি করে তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে বলো না যে, এটি হালাল আর এটি হারাম। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে, তাদের মঙ্গল হবে না।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১১৬)কোনো বিষয়ে শরয়ি বিধান জানতে চাইলে কোরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হবে।আনুগত্যের এই পরিধি জীবনের কোনো নির্দিষ্ট সময় বা কাজে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু, সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২) ইবাদত যেমন আল্লাহর জন্য, তেমনি জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রেও তাঁর নির্দেশ মেনে চলা মুমিনের লক্ষ্য। আর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।বিসমিল্লাহ মুসলমানদের মুখে উচ্চারিত সবচেয়ে পরিচিত বাক্যগুলোর একটি। প্রতিবার এই বাক্য বলার সময় আমাদের মনে রাখা উচিত, আল্লাহর নামে শুরু করা কাজ যেন তাঁর নির্দেশের পরিপন্থী না হয়।ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : শিক্ষক জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকাfaizullahriyadh75@.comবিসমিল্লাহ এর ফজিলত