নিজস্ব প্রতিনিধি:
বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে রাষ্ট্রের ব্যর্থতায়। অপরাধের সামাজিক প্রতিরোধে ঘাটতির দায় সমাজের। ব্যাক্তির দোষ অনেকটাই পরিবারের। ধর্ষণের দায় ও নিতে হবে এই তিন পক্ষকেই।
ধর্ষণ হল সম্মতি ছাড়া বল প্রয়োগের মাধ্যমে ঘটিত একটি জঘন্য যৌন নিপীড়ন ও অপরাধ। যা মানবতার চরম লঙ্ঘন। এটি কেবল শারীরিক নির্যাতন নয় বরং শিকারের মানসিক ও সামাজিক জীবনকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। সমাজ থেকে এই অপরাধ দূর করতে কঠোর আইন প্রয়োগ, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য।
অপরাধী সে যে বয়সেরই হোক, তাকে পাকড়াও করার দায়িত্ব পুলিশের। বিচার করবেন আদালত। তাই শুধুই পিতা-মাতার দোষ খুঁজে বেড়ালেই কর্তব্য কর্ম শেষ হয়ে যায় না। কেননা অপরাধ হয়ে গেলে দায়িত্ব চলে আসে নিরাপত্তা প্রশাসন ও বিচারালয়ের হাতে। তাই ধর্ষকের মতো অপরাধী ধরার বিষয় দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে পুলিশকে। করতে হবে যথাযথ তদন্ত। আর অপরাধ চূড়ান্ত করবে আদালত। ধর্ষকের সাজা কেমন হবে সেটার এখতিয়ার ও তাদের। কিন্তু অপরাধীকে যদি ধরাই না যায় কিংবা তদন্ত ও বিচার কাজ যদি বছরের পর বছর চলে যায় তবে সে ভুক্তভোগীর ভোগান্তির মাত্রা লম্বাই হতে থাকে।
পুলিশ ও আদালতের বেলায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে রাষ্ট্রকে। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় সবকিছু সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকারে। ধর্ষণের দায় ও তাই কোন ক্রমেই এড়াতে পারে না সে। কারণ ধর্ষক ও তারই নাগরিক। তাকে সুনাগরিক করতে না পারার ব্যর্থতা পরিবার ও সমাজের শুধু নয়, রাষ্ট্রেরও বটে।
ধর্ষণ মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এটি ব্যক্তির স্বাধীনতা, সম্মান এবং মৌলিক মানবাধিকারের উপর সরাসরি আঘাত। দিন দিন এই সামাজিক ব্যাধিটি বৃদ্ধি পাওয়ায় আজ নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মধ্যে ছিল অনেক ধর্ষক ও। তাদের শিকার হয় অন্তত দুই লক্ষ ত্রিশ হাজার নারী। নিপীড়িত এই নারীদের সম্মান জানাতে গিয়ে এদেশের অনেক বক্তার দল প্রায়ই সম্ভ্রমহানি শব্দটি প্রয়োগ করে থাকেন। এখানে সম্ভ্রামহানি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ধর্ষকের লজ্জার ভাগ নিতে হয় ধর্ষণের শিকার নারীকেই। অথচ অন্য যেকোন অপরাধের বেলায় দোষ বলুন, লজ্জা বলুন সবই অপরাধীর।
ধর্ষণের কারণ –
১/ নৈতিকতার অবক্ষয়: সমাজের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২/ আইনের প্রয়োগের দীর্ঘসূত্রতা: বিচার হীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীদের যথাসময়ে শাস্তি না হওয়া। ৩/ পর্নোগ্রাফি ও অপসংস্কৃতি: অবাধ তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কুরুচিপূর্ণ বিনোদন যুব সমাজকে বিপথগামী করছে।
৪/ পুরুষ তান্ত্রিক মানসিকতা: নারীর প্রতি অবমূল্যায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করার মানসিকতা।
সমাজ এর প্রভাব –
১/ শারীরিক ক্ষতি: শিকারকে মারাত্মক শারীরিক আঘাত, জটিল রোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে অবাঞ্চিত গর্ভধারণের শিকার হতে হয়।
২/ মানসিক ট্রমা: ভুক্তভোগী আজীবন ভয়, লজ্জা, বিষন্নতা, মানসিক অবসাদ এবং মানসিক অবসাদ বা ট্রামার মধ্যে থাকে।
৩/ সামাজিক অবক্ষয়: সমাজ অনেক সময় অপরাধীকে বাদ দিয়ে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করে যা পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ –
১/ কঠোর আইন ও দ্রুত বিচার: ধর্ষণ রোধে বিদ্যমান আইনের নিরপেক্ষ ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
২/ সামাজিক আন্দোলন: অপরাধীদের সামাজিক ও আইনগতভাবে বয়কট করতে হবে এবং প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।
৩/ সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষা ও নারীর সম্মান বোধ শেখাতে হবে।
ধর্ষণ কোনো সাধারণ অপরাধ নয় এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এই অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে দল মত নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং একটি নিরাপদ বাসযোগ্য রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।