রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩ কার্যালয়ে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, দালালনির্ভর কার্যক্রম এবং ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিআরটিএর উচ্চমান সহকারী তানভীর। একই সঙ্গে মোটরযান পরিদর্শক রাশেদ মিলনকে ঘিরেও অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগকারীদের দাবি, তানভীর দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিএর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে দায়িত্ব পালন করেছেন। মিরপুরের ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১-এ দায়িত্ব পালনকালে তাকে ঘিরে ঘুষ লেনদেন ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। পরে টাঙ্গাইল বিআরটিএতে বদলি হলেও সেখানেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এরপর আবার তিনি ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩, দিয়াবাড়িতে ফিরে আসেন।অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বর্তমানে দিয়াবাড়ি কার্যালয়ে ফিরে এসে তানভীরকে ঘিরে নতুন করে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। আর এই বলয়ের সঙ্গে দালালদের একটি অংশের যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।তবে তানভীর ও রাশেদ মিলনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তাদের বক্তব্য ছাড়া অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।দালালবিরোধী অভিযানেও থামছে না অভিযোগ,উত্তরা দিয়াবাড়ি বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালদের তৎপরতা নিয়ে সম্প্রতি একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে তিন দালালকে কারাদণ্ড এবং চারজনকে অর্থদণ্ড দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি বন্ধ করে কার্যালয়কে দালালমুক্ত করা।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলার পরও কীভাবে একই কার্যালয়ে দালালনির্ভর সেবার অভিযোগ টিকে থাকে?সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে উত্তরা বিআরটিএকে ঘিরে দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগও উঠে এসেছে।দালাল ছাড়া কাজ কঠিন’ সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ,সেবাপ্রার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, সরাসরি অফিসে গিয়ে নিয়ম মেনে কাজ করতে গেলে বিভিন্ন ধাপে জটিলতা তৈরি হয়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমে গেলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ পাওয়া যায়।এমন অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রশ্ন নয়; বরং সরকারি সেবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।অনুসন্ধানে তাই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন,কোন কোন দালাল নিয়মিতভাবে কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে সক্রিয়, তারা কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং তাদের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া সেবার সংখ্যা ও ধরন কী।রাশেদ মিলনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন,মোটরযান পরিদর্শক রাশেদ মিলনের নেতৃত্বে অনিয়মের একটি বলয় পরিচালিত হচ্ছে—এমন অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে যানবাহনের ফিটনেস, পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে দালালদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ বা কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এই মুহূর্তে প্রতিবেদকের হাতে নেই। ফলে অভিযোগগুলো যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, সেবা রেকর্ড এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য সংগ্রহ করা জরুরি।মিরপুর থেকে টাঙ্গাইল, এরপর দিয়াবাড়ি,বদলির ইতিহাসও অনুসন্ধানের দাবি, তানভীরের কর্মস্থল পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মিরপুর বিআরটিএতে দায়িত্ব পালনের সময় তাকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর টাঙ্গাইলে বদলি করা হয়। পরে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি।এখানে অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,তার বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো লিখিত অভিযোগ হয়েছিল কি না, বিভাগীয় তদন্ত হয়েছিল কি না, তদন্তের ফলাফল কী এবং কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাকে পুনরায় ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩-এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।সম্পদের হিসাবেও নজর দেওয়ার দাবি,তানভীরের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগে মিরপুরের সেনপাড়া, ধানমন্ডিসহ কয়েকটি এলাকায় সম্পত্তির কথা বলা হচ্ছে। পাশাপাশি বরিশাল-ভোলা অঞ্চলেও তার পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পদের বাইরে অতিরিক্ত সম্পত্তি রয়েছে কি নাতা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।তবে এসব সম্পত্তির মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস কিংবা বৈধতা সম্পর্কে কোনো সরকারি নথি প্রতিবেদকের হাতে না থাকায় এগুলোকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।এ ক্ষেত্রে তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল এবং সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রি নথি যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।বিআরটিএতে দুর্নীতির অভিযোগে আগেও দুদকের অভিযান,বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে ঘুষ, জালিয়াতি ও দালালচক্রের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের ৭ মে দুদক দেশব্যাপী ৩৫টি বিআরটিএ কার্যালয়ে অভিযান চালায়। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস সনদ প্রদানে দালালের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি ও দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগে এসব অভিযান পরিচালিত হয়; এর মধ্যে উত্তরা কার্যালয়ও ছিল।২০২৬ সালেও মিরপুর বিআরটিএতে দালালবিরোধী অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেওয়ার খবর এসেছে।ফলে প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ!বারবার অভিযান, কারাদণ্ড ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরও যদি দালালচক্র সক্রিয় থাকে, তাহলে এর নেপথ্যে কারা?যে বিষয়গুলো তদন্তে আসা প্রয়োজন,অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে, তানভীরের গত কয়েক বছরের বদলি ও দায়িত্ব পালনের নথি।তার বিরুদ্ধে করা পূর্বের লিখিত অভিযোগ ও বিভাগীয় তদন্তের তথ্য।তার আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণী।মিরপুর, সেনপাড়া ও ধানমন্ডিতে কথিত ফ্ল্যাটের মালিকানা ও অর্থের উৎস।ব্যাংক লেনদেন ও আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য।দালালদের সঙ্গে কথিত যোগাযোগের তথ্য।রাশেদ মিলনের অধীনে যানবাহন পরিদর্শন ও ফিটনেস সংক্রান্ত কার্যক্রম। দালালদের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া সেবার নথি। কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রবেশ-প্রস্থান রেকর্ড।অভিযোগের সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা।জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন বড় প্রশ্ন?বিআরটিএর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষ সরাসরি সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। সেখানে দালাল ছাড়া কাজ হয় না কিংবা অর্থ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন,এমন অভিযোগ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।তাই তানভীর ও রাশেদ মিলনকে ঘিরে,ওঠা,অভিযোগগুলো,দ্রুত,নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে দেওয়া দরকার।অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ,তবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার মতো যথেষ্ট প্রশ্ন ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।