• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন
Headline
গণতন্ত্র ও বাংলাদেশে বিরোধী রাজনীতি জেল হত্যা: 'প্রেসিডেন্ট বলেন, আর্মি অফিসাররা যা চায় সেটা কর' প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কী অবস্থা কী পরিমাণ ডলার খরচ হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায়? ইউরোপের সাতটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি তারেক-সির সমঝোতা বাস্তবায়নে ঢাকায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মন্ত্রী যে তিনভাবে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল আসতে পারে মোগল জাহাজে ডাকাতিতে জড়িত ব্যক্তির নামে নিউইয়র্কের সৈকত  সাংবাদিককে কনডেম সেলে রাখার অভিযোগে লিগ্যাল নোটিশ; ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্থানান্তর না হলে হাইকোর্টে রিট অবশেষে গুড়িয়ে দেয়া হলো বসত ঘরের মাঝের সেই দুটি কবর

গণতন্ত্র ও বাংলাদেশে বিরোধী রাজনীতি

Reporter Name / ১ Time View
Update : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

গণতন্ত্র রক্ষা ও একে সুসংহত করতে বিরোধী দলের এবং একই সূত্রে সরকারি দলেরও ভূমিকা নিয়ে আলোচনার সময় আমরা প্রায়ই একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাই: আমরা ঠিক কোন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই? গণতন্ত্রের রূপ নানাবিধ হতে পারে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রার কেবল সূচনাই ঘটে; কিন্তু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনও দুটি ভিন্ন রূপ নিতে পারে। একদিকে ক্ষমতা একক দল বা ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে তৈরি হতে পারে ‘সংখ্যাগুরুর স্বৈরতন্ত্র’; অন্যদিকে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গিয়ে জন্ম নিতে পারে ‘অভিজাতদের স্বৈরতন্ত্র’, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রান্তিক হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের মূল সংগ্রামটিই হলো এই দুই চরমপন্থার মাঝখানে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে নেওয়া। লক্ষ্য একটাই, যাতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণের সময় জনগণের আসল কণ্ঠস্বর ও উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটে। তাই গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ‘আদর্শ’ ভূমিকা কেমন হবে, তা নির্ভর করে আমরা রাষ্ট্রে ঠিক কোন ধরনের গণতান্ত্রিক কাঠামো দেখতে চাই, তার ওপর।বাংলাদেশে অনেকের কাছেই গণতন্ত্রের ধারণাটি অত্যন্ত সংকুচিত। পাঁচ বছর পরপর একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদল ঘটলেই এখানে রাষ্ট্রকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলে ধরে নেওয়া হয়। গণতন্ত্রের এই ন্যূনতম সংজ্ঞাকে পুরোপুরি ভুল বলা যাবে না। তবে আমাদের মনোযোগ যদি কেবল নির্বাচনের দিনটিতেই নিবদ্ধ থাকে, তবে মধ্যবর্তী সময়ে বিরোধী দলের কাছ থেকে গঠনমূলক কিছু আশা করা অর্থহীন। এমন ব্যবস্থায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর ভোট হবে ঠিকই, কিন্তু দুই নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকবে ক্ষমতাসীনদের হাতে; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হারাবে স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের ভূমিকা কেবল ব্যালট পেপারে সিল মারাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিরোধী দল পাঁচ বছর ধরে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনার কোনো সুযোগ পায় না, অথচ পাঁচ বছর পর বিশাল ক্ষমতা নিয়ে সরকার গঠনের দৌড়ে নেমে পড়ে। এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বিরোধীদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা যায় না।অন্যদিকে আমরা যদি গণতন্ত্রকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি যেখানে সরকারি নীতি নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে, যেখানে একক আধিপত্যের সুযোগ থাকবে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে নির্বাহী বিভাগের ওপর কঠোর নজরদারি থাকবে, তাহলেই বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকার সুযোগ তৈরি হয়। মূলত আমরা এমন এক প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাই, যা রাজনীতিকে ‘বিজয়ীই সব নিয়ে নেয়’ নীতি থেকে সরিয়ে ‘কিছু জেতো কিছু হারো’ নীতির ওপর দাঁড় করায়।তবে কোনো ক্ষমতাসীন দলই স্বেচ্ছায় নিজেদের ক্ষমতা সীমিত করতে চায় না। তাই এই রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার যৌক্তিকতা তুলে ধরা, নাগরিক সমাজের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলা এবং কাঠামোগত সংস্কারের জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করাই বিরোধী দলের মূল কাজ হতে হবে। তবে প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতন্ত্রেরও একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায়ই এই ব্যবস্থা অভিজাতদের দর-কষাকষির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল করে ফেলে এবং নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রভাবের পথ সংকুচিত করে। প্রতিনিধিরা যেন সুনির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক সংকীর্ণ দাবির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এই তত্ত্বের সুযোগ নিয়ে বাস্তবে নাগরিকদের মতামতকে উপেক্ষিত রাখা হয়। এই সীমাবদ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের’ ভাবনা, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই ধারা হতে পারে বেশ পরিবর্তনকামী, যেমন নাগরিক সমাবেশ বা নিয়মিত গণভোটের মাধ্যমে বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া। আবার এটি হতে পারে একটি কার্যকর পরামর্শমূলক ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকেরা সহজেই তাঁদের দাবি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। অবশ্যই এমন অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় রাখতে হয়, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের চাওয়ায় সংখ্যালঘুর অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। আমরা যদি এমন প্রাণবন্ত গণতন্ত্র গড়ে তুলতে চাই, তবে বিরোধী দলকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি আসতে হবে।গণতন্ত্রের এই তিন ধরন নির্বাচনী—উদার প্রাতিষ্ঠানিক এবং অংশগ্রহণমূলক পরস্পরের বিরোধী নয়। অবাধ নির্বাচন যদি ভিত্তিপাথর হয়, তবে উদার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হলো ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের বর্ম, আর অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা হলো সাধারণ মানুষের ক্ষমতার চাবিকাঠি। আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই তিন মাত্রাকে একটি সুতায় গাঁথা। আমরা যত বেশি নিছক ‘ভোটকেন্দ্রিক’ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নীতিনির্ধারণে নাগরিককে সম্পৃক্ত করার দিকে যাব, বিরোধী দলের গুরুত্ব ততটাই বাড়বে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিরোধীদের ভূমিকা আরও বেশি সংবেদনশীল ও জরুরি। শাসক দল যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণে অনিচ্ছুক, সমালোচনা সহ্য করতে নারাজ, আমলাতন্ত্রের দলীয়করণে ব্যস্ত, দল ও সরকারকে একাকার করে ফেলছে এবং নিজস্ব কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ, তখন ক্ষমতাসীন দল নিজে থেকে কোনো সংস্কার করবে, এমন আশা করা ভুল। স্বৈরাচারী প্রবণতার মুখে ক্ষমতার লাগাম টানতে বিরোধী দলকেই রাজপথ ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ ও বিকল্প ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করতে হবে।অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহানপ্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে বর্তমান বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো কি সেই দায়িত্ব পালন করছে? দুঃখজনকভাবে বিরোধীদের রাজনীতি এখনো সংঘাতকেন্দ্রিক এবং নাগরিকমুখী চিন্তাভাবনা থেকে দূরে। একটি প্রগতিশীল ও গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতি বাস্তবায়নে তাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি।প্রথমত, শুধু সরকারি কর্মকাণ্ডের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে কীভাবে একটি টেকসই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা যায়, তার স্পষ্ট যৌক্তিকতা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা। ক্ষমতাসীন অভিজাত জোটে ফাটল ধরাতে সুশীল সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের নিয়ে একটি পাল্টা সংস্কারবাদী রাজনৈতিক অক্ষ গড়ে তোলা প্রয়োজন।দ্বিতীয়ত, ‘লংমার্চ’ বা শক্তি প্রদর্শনের চিরাচরিত কর্মসূচির রাজনৈতিক কার্যকারিতা এখন তলানিতে। কেবল নিজেদের সমর্থক জমায়েত না করে বিরোধী দলকে পৌঁছাতে হবে আপামর জনগণের দোরগোড়ায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা কিংবা দুর্নীতির মতো দৈনন্দিন সংকটগুলো যে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থারই ফসল, তা সাধারণ মানুষকে প্রাঞ্জল ভাষায় বোঝাতে হবে। এই ক্লান্তিহীন ও ধৈর্যশীল কাজ ছাড়া গণ–আস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়।তৃতীয়ত, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট ভিশন থাকা চাই। জনতুষ্টিবাদ, ধর্মীয় চরমপন্থা কিংবা বৈষম্যমূলক মানসিকতার ওপর ভর করে কোনো দল গণতান্ত্রিক কাঠামো ব্যবহার করলেও তা শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্রেই রূপ নেয়। বিরোধী দলকে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে যে ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গপরিচয়–নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং ভিন্নমতকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণের এক উদার সংস্কৃতি তারা গড়ে তুলবে। সংখ্যালঘুর অধিকার সুরক্ষা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই উদার গণতান্ত্রিক হতে পারে না।বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দলগুলো এই জায়গায় কতটুকু সফল?সবচেয়ে বড় বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামীর কথাই ধরা যাক। দলটি রাজনৈতিক সমঝোতা কিংবা বস্তুনিষ্ঠ সংস্কার প্রস্তাবের চেয়ে মুখোমুখি সংঘাত ও আবেগসর্বস্ব রাজনীতিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ‘সংস্কার’ শব্দটিকে তারা রাজনৈতিক মুখরোচক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করলেও নিজেদের আদর্শের সঙ্গে মেলে না এমন সংস্কার প্রস্তাব (যেমন নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন) তারা স্রেফ এড়িয়ে যায়। গঠনমূলক বিকল্প নীতি উপস্থাপন না করে ১৯৯০-এর দশকের পুরোনো কৌশল নিয়েই তারা হাঁটছে।তুলনামূলক তরুণ রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) অবস্থান কিছুটা আলাদা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি তাদের আন্তরিকতা রয়েছে এবং তাদের তরুণ সংসদ সদস্যরা সংসদে যুক্তিনিষ্ঠ ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখছেন।একই সঙ্গে জামায়াত যে সমাজের স্বপ্ন দেখায়, তা একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা দলে প্রচুর নারী নেতৃত্বের দাবি করলেও নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়নে নীরব থাকে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জনে তারা চরমভাবে ব্যর্থ। বাংলাদেশ যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মূলত একটি সর্বজনীন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না—এই সত্য গ্রহণে দলটির ঐতিহাসিক দ্বিধা রয়েছে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অংশ হিসেবে তারা সমাজে সাংস্কৃতিক বিভাজন বাড়াতে এবং ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী জনস্রোতে ভাসতে মুখিয়ে থাকে। ফলে তাদের পরিবর্তনকামী রূপরেখা কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়।এর বিপরীতে তুলনামূলক তরুণ রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) অবস্থান কিছুটা আলাদা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি তাদের আন্তরিকতা রয়েছে এবং তাদের তরুণ সংসদ সদস্যরা সংসদে যুক্তিনিষ্ঠ ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখছেন। তাঁরা বিকল্প নীতির রূপরেখাও তুলে ধরছেন। তবে দলটি নাগরিকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া কিংবা তাদের দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে সংস্কার এজেন্ডাকে যুক্ত করার দিকে খুব কমই মনোযোগ দিচ্ছে। নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ না করেই তারা একটি অসম্ভব যুদ্ধ জেতার চেষ্টা করছে। তদুপরি এনসিপি একটি স্পষ্ট ‘হ্যামলেটীয় দ্বিধা’র মুখোমুখি হচ্ছে বলে মনে হয়, যেখানে একদিকে বহুত্ববাদ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সব নাগরিকের সমান অধিকারের প্রতি তাদের ঘোষিত অঙ্গীকার এবং অন্যদিকে রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ মনোভাবকে তুষ্ট করার রাজনৈতিক চাপ—এই দুইয়ের মাঝখানে তারা আটকে পড়ছে।একটি দেশে বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি শুধু সরকার ফেলার ক্ষমতা বা নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে না। তা পরিমাপ করা হয় প্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার, নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অজনপ্রিয় হলেও সত্য ও অন্যের অধিকার রক্ষার সৎ সাহসের মাধ্যমে। দলটি প্রকাশ্যে নারীর অধিকার এবং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার কথা বললেও প্রায়ই নিজেদের নীতিগত অবস্থানে অবিচল থাকতে ব্যর্থ হয় এবং দ্রুতই আপস করার পথ বেছে নেয়। শেক্​সপিয়ারের হ্যামলেটের মতো এনসিপি কোনো একটি নীতিগত অবস্থানের দিকে এগোয় ঠিকই, কিন্তু সেই অবস্থানের জন্য যখন রাজনৈতিক সাহসের প্রয়োজন হয়, তখনই তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার নীতির বিষয়ে তাদের অবস্থানকেও ক্ষুণ্ন করেছে।এনসিপি অন্য একটি সমস্যায়ও ভুগছে। তাদের কোনো কোনো নেতা কেবল জনতুষ্টিবাদী বক্তব্যই গ্রহণ করেননি, বরং ব্যক্তিগত অপমান, কুরুচিপূর্ণ নামে ডাকা এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার মতো তথাকথিত কাদা–ছোড়াছুড়ির রাজনীতিতে জড়িয়েছেন। এনসিপির কিছু নেতা তাঁদের সহকর্মীদের চর্চিত এই রাজনীতির দায় নিতে অস্বীকৃতি জানালেও দলটি এ পর্যন্ত জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয়নি। এ ধরনের রাজনীতি সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়ায় এবং ‘আমরা বনাম তারা’ নামের এক ক্ষতিকর সামাজিক মনস্তত্ত্ব তৈরি করে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।এ ছাড়া সংসদের বাইরে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির কথা বললে বামপন্থী দলগুলোর রয়েছে তীব্র সাংগঠনিক সক্ষমতার অভাব; চরম-ডানপন্থী দলগুলোর দর্শন উদার গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত; আর তরুণ রাজনৈতিক মঞ্চগুলোর সদিচ্ছা ও আধুনিক মূল্যবোধ থাকলেও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে তাদের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।একটি দেশে বিরোধী দলের প্রকৃত শক্তি শুধু সরকার ফেলার ক্ষমতা বা নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে না। তা পরিমাপ করা হয় প্রতিষ্ঠান গড়ার অঙ্গীকার, নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং অজনপ্রিয় হলেও সত্য ও অন্যের অধিকার রক্ষার সৎ সাহসের মাধ্যমে। বাংলাদেশের আজ এমন এক বিরোধী রাজনীতি প্রয়োজন, যা ক্ষমতার লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহি, সুশাসন ও সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেবে। এমন বিরোধী দল ছাড়া ‘গণতন্ত্র’ কেবল ভোটের দিনের একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়েই থাকবে, আর প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। l* আসিফ মোহাম্মদ শাহান: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা