স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে গভীর রাতে বাবাকে ভিডিও কল করেছিলেন জুমরাতুন নেছা বর্ষা (২৪)। নির্যাতনের কথা জানিয়ে মা–বাবার কাছে সাহায্য চান তিনি। একপর্যায়ে ভিডিও কলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর মেয়ের বাসায় খোঁজ নিতে গিয়ে পরিবার জানতে পারে, বর্ষা আর বেঁচে নেই।গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে রাজধানীর মণিপুরিপাড়ার একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে। পরে বর্ষাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেছেন বর্ষার বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন। তিনি লালবাগের স্থায়ী বাসিন্দা।বর্ষার চাচা শেখ জাকির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ভালোবেসে এক বছর আগে বর্ষা ও নাবিদ হোসাইনের বিয়ে হয়েছিল। নাবিদ কোনো কাজ করতেন না। বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে শ্বশুরের কাছে টাকা চাইতেন। বর্ষার পরিবার আগেও কয়েকবার তাঁকে টাকা দিয়েছিল। তবে টাকা চাওয়া নিয়ে স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। বর্ষাকে মারধরও করা হতো। এর আগে একবার মারধরের শিকার হয়ে বর্ষাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। এসবের কিছুই তখন তাঁদেরকে জানানো হয়নি।ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে জাকির হোসেন বলেন, মঙ্গলবার আবার তাঁর ভাইয়ের কাছে টাকা চাওয়া নিয়ে বর্ষাকে মারধর করা হয়। শ্বশুরবাড়ির একজন মারধরের দৃশ্য ধারণ করে বর্ষার পরিবারকে পাঠায়। মারধর সহ্য করতে না পেরে রাত ১২টার দিকে বর্ষা তাঁর বাবাকে ভিডিও কল দেন। ভিডিও কলে তাঁকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। আর বারবার বলতে থাকেন তাঁকে যেন ওই বাসা থেকে বাবার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। না নিয়ে গেলে তাঁকে মেরে ফেলবে, এমন কথাও বলছিলেন বর্ষা। একপর্যায়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।জাকির হোসেন বলেন, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর বর্ষার মা–বাবা ওই বাসার উদ্দেশে রওনা হন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে মণিপুরিপাড়ার ওই বাসার সামনে গিয়ে তাঁরা একটি অ্যাম্বুলেন্স দেখতে পান। পরে শ্বশুরকে জিজ্ঞাসা করার পর তাঁরা জানান, বর্ষা আত্মহত্যা করেছেন। তাঁকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। এই কথা শোনার পর তাঁরাও হাসপাতালে যান। তখনো তাঁরা জানতেন না বর্ষা মারা গেছেন। হাসপাতালে যাওয়ার পর বর্ষাকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর সময় তাঁরা ডাকাডাকি করতে থাকেন। পরে কর্তব্যরত নার্সরা পরীক্ষা করে জানান, বর্ষা মারা গেছেন।এ বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, যৌতুকের দাবিতে বিভিন্ন সময় বর্ষাকে মারধর করতেন তাঁর স্বামী নাবিদ হোসাইন। বর্ষার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বর্ষার বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। পরে হাসপাতাল থেকে নাবিদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে আদালতেও পাঠানো হয়েছে। তদন্ত চলছে।বর্ষার স্বজনদের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে ব্যবসা ও মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য বর্ষাকে চাপ দিতেন নাবিদ। বর্ষার বাবা কয়েকবার টাকা দিলেও তা দিয়ে তিনি মাদক সেবন করেন। সে কারণে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় বর্ষার পরিবার। এর জের ধরে বর্ষার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। মারধরের কথা সব সময় পরিবারকেও জানাতেন না বর্ষা।