মাঞ্জারুল ইসলাম:
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখা ঘিরে অনিয়ম, দালালনির্ভরতা ও অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি নিয়মে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও অতিরিক্ত টাকা না দিলে লাইসেন্স পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার দালালের মাধ্যমে টাকা দিলে কাজ সহজ হওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মোহাম্মদ রুহুল আমীন। সরকারি ওয়েবসাইটে তার পদবি সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। একই সরকারি সেবা তালিকায় ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু, পুনঃপরীক্ষা, নবায়নসহ একাধিক সেবার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেও তার নাম রয়েছে।সব ঠিক আছে, কাল পাস হয়ে যাবে’তারপরই ফেল!সরেজমিন অনুসন্ধানে কয়েকজন ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশীর সঙ্গে কথা বলে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মতো বক্তব্য পাওয়া গেছে।তাদের কয়েকজনের ভাষ্য, ফিঙ্গার প্রিন্ট দেওয়ার পর প্র্যাকটিক্যাল ও ভাইভা পরীক্ষার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন তারা। পরীক্ষার পর সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে ‘সব ঠিক আছে’, ‘আগামীকাল পাস হয়ে যাবেন’এমন আশ্বাসও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।কিন্তু পরদিন মোবাইল ফোনে, ফলাফলের মেসেজ আসার পর দেখা যায়, তারা অকৃতকার্য (ফেল) হয়েছেন।এ অবস্থায় তাদের প্রশ্ন? পরীক্ষা যদি যথাযথভাবে নেওয়া হয়ে থাকে এবং পরীক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিক ভাবে কোনো গুরুতর ত্রুটির কথা জানানো না হয়ে থাকে, তাহলে পরদিন ফলাফলে ফেল দেখানোর কারণ কী?তবে কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীকে কেন অকৃতকার্য ঘোষণা করা হয়েছে, তার প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার রেকর্ড, মূল্যায়নপত্র ও ডাটাবেজ যাচাই করা প্রয়োজন।‘টাকা দিয়েছি দালালকে, এবার পাস হব তো?’ অনুসন্ধানে আরও কয়েকজন সেবাগ্রহীতার বক্তব্য পাওয়া গেছে, যারা দাবি করেছেন,ড্রাইভিং লাইসেন্সের কাজ সহজ করার আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে দালালরা অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে।একজন সেবাগ্রহীতার বক্তব্যের সারমর্ম হলো, ‘ফিঙ্গার দিতে টাকা দিয়েছি, কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল ও ভাইভার জন্য আলাদা টাকা দিতে পারব না। তাহলে কি পাস হব?’এই বক্তব্যই পুরো ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে সরকারি ফি পরিশোধের পর একজন নাগরিককে কেন অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চিন্তা করতে হবে?অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিষয় নয়; বরং পুরো সেবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও পরীক্ষাপদ্ধতির ওপর প্রশ্ন তৈরি করে।সরকারি ফি নির্ধারিত, তাহলে অতিরিক্ত টাকা কেন?
বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলের সরকারি সেবা তালিকায় বিভিন্ন ধরনের ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত ফি উল্লেখ রয়েছে এবং অনলাইন প্রক্রিয়ায় আবেদন ও ফি পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। একই তালিকায় ড্রাইভিং লাইসেন্সের দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পর পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।এ কারণে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো,সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ কোথায়, কার কাছে এবং কী কারণে নেওয়া হচ্ছে?মোটরযান পরিদর্শকদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন,ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলের সরকারি কর্মকর্তাদের তালিকায় সালেহ আহাম্মদ মোটরযান পরিদর্শক হিসেবে রয়েছেন। একই তালিকায় মোহাম্মদ রানা-সহ আরও কয়েকজন মোটরযান পরিদর্শকের নাম রয়েছে।তবে কোন কর্মকর্তা কোন শাখা বা কোন পর্যায়ের পরীক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন, তা অফিস আদেশ ও দায়িত্ব বণ্টনের নথি দিয়ে যাচাই করা জরুরি।লাইসেন্স শাখার কার্যক্রমে কোনো কর্মকর্তা নিয়ম বহির্ভূত ভাবে অন্য কর্মকর্তার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রণ করছেন কি না এমন অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ, ডিউটি রোস্টার এবং পরীক্ষার দায়িত্ব বণ্টনের নথি প্রকাশের দাবি উঠতেই পারে।দুদকের অভিযান: অভিযোগকে নতুন মাত্রা,ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ে ঘুষ ও দালালচক্রের অভিযোগ যে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর দুদক অভিযান দিয়ে।প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ছদ্মবেশে প্রায় এক ঘণ্টা কার্যালয় পর্যবেক্ষণ করে। এ সময় এক আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ শনাক্ত করার কথা জানানো হয়। একই প্রতিবেদনে বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।তবে ওই অভিযানের তথ্য থেকে মোহাম্মদ রুহুল আমীন ব্যক্তিগতভাবে অনিয়মে জড়িত এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তার বিরুদ্ধে ওঠা নির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।প্রশ্ন উঠছে পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়েও ড্রাইভিং লাইসেন্স একটি জননিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়। ফলে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় প্রকৃত যোগ্যতার ভিত্তিতে ফলাফল নির্ধারণ হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।যদি কোনো পরীক্ষার্থী প্রকৃতপক্ষে দক্ষ না হওয়ায় ফেল করেন, তাহলে তার মূল্যায়নের কারণ স্পষ্ট থাকা উচিত।আবার যদি অভিযোগ অনুযায়ী যোগ্য পরীক্ষার্থীকে অতিরিক্ত টাকা না দেওয়ার কারণে ফেল করানো হয়, তাহলে সেটি আরও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ হিসেবে তদন্তের দাবি রাখে।এ কারণে অনুসন্ধানে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো যাচাই করা জরুরি,পরীক্ষার্থীর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার মূল্যায়নপত্র রয়েছে কি না।ভাইভা পরীক্ষার কোনো রেকর্ড বা মূল্যায়ন পদ্ধতি কী।পরীক্ষার ফল কে এবং কীভাবে অনুমোদন করেন।
একই পরীক্ষকের অধীনে পাস-ফেলের হার কত।দালালের মাধ্যমে আবেদন কারীদের পাসের হার সাধারণ আবেদনকারীদের তুলনায় ভিন্ন কি না।পরীক্ষার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা হয় কি না।পরীক্ষার্থীর ফেল করার কারণ তাকে জানানো হয় কি না।পুনঃপরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো মধ্যস্থতাকারী অতিরিক্ত অর্থ দাবি করছে কি না।সরকারি ফির বাইরে অর্থ লেনদেনের কোনো মোবাইল ব্যাংকিং, কল রেকর্ড বা সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে কি না।কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টনের লিখিত আদেশ কী বলে।কে এই রুহুল আমীন?’প্রশ্নের উত্তর সরকারি নথিতেই,সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, মোহাম্মদ রুহুল আমীন ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.)। সরকারি সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতিতে তাকে শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স, পুনঃপরীক্ষার তারিখ গ্রহণ, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু, নবায়ন ও শ্রেণি সংযোজনসহ একাধিক সেবার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।সুতরাং তার দায়িত্বাধীন সেবা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে অভিযোগগুলো যাচাই করার প্রশাসনিক দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রয়েছে।সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য এবং ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ে দুদকের সাম্প্রতিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে লাইসেন্স শাখার কার্যক্রম নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠেছে।
তদন্তে পরীক্ষার ফলাফল, মূল্যায়নপত্র, সিসিটিভি ফুটেজ, দায়িত্ব বণ্টনের অফিস আদেশ, দালালদের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য, সরকারি ফি জমার রেকর্ড এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।