রাহাদ সুমন,বরিশাল ব্যুরো:
বরিশালে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সড়ক অবরোধ ও মিছিল করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতারা। ঠেকাতে গেলে ছুড়েছেন ককটেল ও পেট্রল বোমা। এতে বিঘ্নিত হয়েছে দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা। এসব অভিযোগ উল্লেখ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ২৪৮ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মারজুক আব্দুল্লাহ নামে এক যুবক। আসামির তালিকায় আছে চারজন মৃত নেতার নাম।
মারজুক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা।বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বৃহস্পতিবার তিনি করেছেন এই মামলা। বিচারক এস এম শরীয়ত উল্লাহ অভিযোগ আমলে নিয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনারকে তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার জানিয়েছেন, এই নালিশী মামলায় অস্ত্র, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে আসামির তালিকায় চারজন প্রয়াত নেতার নাম যুক্ত করায় অভিযোগের সত্যতা ও মামলার উদ্দেশ্য নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
মামলাটির আসামির তালিকায় আছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, সাবেক সাংসদ জেবুন্নেছা আফরোজ, বরিশাল জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর, সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান রিন্টু, সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র জিয়াউর রহমান বিপ্লব এবং রফিকুল ইসলাম খোকন।
আরও আছে সিটির ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি খন্দকার রেজাউর রহমান রেজা, ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবুল ফারুক হুমায়ুন, ২২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এইচ এম হাফিজুর রশিদ শিবলী ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী হাওলাদারের নাম।
এর মধ্যে মামলার ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর মারা গেছেন ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি। মারজুকের অভিযোগ, রেজাউর গত ১০ জুন নগরীর গড়িয়ারপার এলাকায় আওয়ামী লীগের ব্যানারে মিছিল করেছেন এবং সড়কে হাতবোমা ছুড়েছেন।
মামলার ১৯৮ নম্বর আসামি আবুল ফারুকের মৃত্যু হয়েছে ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ। তার বিরুদ্ধেও ১০ জুনের মিছিলের অভিযোগ। ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর মারা যান ২২৫ নম্বর আসামি হাফিজুর রশিদ এবং একই বছরের ২৬ জুলাই মারা যান ১৯৫ নম্বর আসামি আলী হাওলাদার। তাদের বিরুদ্ধেও আনা হয়েছে ওই মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ।
বরিশাল সিটির ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রাজীব হোসেন খান বলেছেন, ‘মারজুক নামের যে ব্যক্তি মামলাটি করেছেন তাকে বরিশালের সবাই মামলা ব্যবসায়ী বলে চেনেন। আগেও তিনি একটি মামলা করেছিলেন। এই মামলা যে ভুয়া সেটার বড় প্রমাণ আসামি চারজন মৃত। তারা কি কবর থেকে উঠে এসে বাদীর ওপর ককটেল নিক্ষেপ করেছেন? মারা যাওয়া ওই চার নেতার জানাজায় ছিলাম আমি।’
বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক নেতা বলেছেন, ‘এই চারজন অনেকদিন আগেই মারা গেছেন। তারা বরিশাল সিটিতে বেশ পরিচিত ছিলেন। এই মামলা যিনি করেছেন, তিনি আসামি করার ভয় দেখিয়ে অনেকের থেকে চাঁদা তুলেছেন।’
এসব বিষয়ে মামলার বাদী বরিশাল নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ক্লাব রোডের বাসিন্দা মারজুক আব্দুল্লাহর কাছে জানতে চাইলে মুঠোফোনে মামলার সাক্ষীদের ওপর দায় চাপালেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘রেজা নামে যে ব্যক্তির নাম দেওয়া হয়েছে মামলার আসামি হিসেবে, সেটা সাক্ষীদের ভুলের কারণে এসেছে। বাকি তিনজনের বিষয় আমি কিছু জানি না। সাক্ষীদের ভুল ইনফরমেশনের কারণে এমনটা হয়েছে।’
বরিশালের গবেষক আনিসুর রহমান খান স্বপনের মন্তব্য, মামলায় মৃতদের আসামি করা হয়ে থাকলে তা আদালত অবমাননা ও আদালতকে বিভ্রান্ত করার ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের স্ব-প্রণোদিত হয়ে কাজ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বরিশাল আদালতের সিনিয়র আইনজীবী মেহেদী হাসান বলেন, তদন্তে মামলার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে বাদী ও সাক্ষীদের আদালত ব্যবস্থা নিতে পারে।
মারজুক আব্দুল্লাহ ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল জেলার সাবেক সমন্বয়ক। এখন তিনি জাতীয় ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। বরিশাল সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের ১৪ মে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমুসহ ২৪৭ জনের নামে জুলাইয়ের মামলা করেছিলেন মারজুক। সেসময় তার বিরুদ্ধে আসামি তালিকায় নাম রাখা ও বাদ দেওয়া নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছিল।
বৈষম্যবিরোধীর নেতারাই সংবাদ সম্মেলন করে তখন মারজুকের বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার পদ স্থগিত করে সংগঠনটির জেলা কমিটি।