• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন
Headline
ব্রাজিলে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত লুলা, সামনে বৈরী কংগ্রেস ও বিভক্ত দেশ মাসরিকের স্বপ্নের পাশে বন্ধুরা প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ছাত্রীকে অপহরণের অভিযোগ, মাদ্রাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা সীমান্তে অপরাধ খুঁজতে গিয়েই সন্ত্রাসীদের নিশানা হন আলিফ ব্যবসায়ীকে আটকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, গ্রেপ্তার ৬ ডেন্টাল হাইজিনিস্ট থেকে শিল্পী, ফ্লোরিডায় উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে চলেছেন সন্দ্বীপের জাহান রিমা শরিয়া আইনে ‘তাজির’ কী, তাজিরে কি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় এমবাপ্পের জোড়া গোলে তছনছ বার্সার ঘর সুরের টানে জমজমাট সিডনি অপেরা হাউস ঢাকায় ৫ নভেম্বর এআই বিজনেস সামিট, অংশ নেবে শতাধিক স্টার্টআপ

সীমান্তে অপরাধ খুঁজতে গিয়েই সন্ত্রাসীদের নিশানা হন আলিফ

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে ইট বিছানো একটি রাস্তা গেছে গ্রামের দিকে। সেই রাস্তা ধরে মিনিট তিনেক যাওয়ার পর পাওয়া গেল রবিন রাংসার দোকান। সেখানে চা, বিস্কুট এবং কিছু মুদিপণ্য বিক্রি হয়।দোকানটির কাছেই ১৫ অক্টোবর রাত সাড়ে আটটার দিকে গুলি করে হত্যা করা হয় নেত্রকোনার সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে (৪৪)। ঘটনার সময় দোকানেই ছিলেন রবিন রাংসা। তিনি গত শুক্রবার আমাদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন।রবিন বলেন, সেদিন রাত আটটার দিকে তাঁর দোকান থেকে ছয়টি সিগারেট কিনেছিলেন আলিফ। দোকানের টেবিলে বসে একটি সিগারেট শেষ করেন। তারপর শ্বশুরবাড়ির দিকে যান। তাঁর শ্বশুরবাড়ি কাছেই। সেখানে তিনি বছর দুয়েক ধরে অনেকটা স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। যাওয়ার সময় ভুলে নিজের মুঠোফোনটি টেবিলে রেখে যান।রবিন আরও বলেন, তখন আরও দুজন ক্রেতা আসেন, সিগারেট কেনেন। একজনের পরনে লুঙ্গি, অন্যজনের পরনে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। কিছুক্ষণ পরই আলিফ ফিরে আসেন এবং মুঠোফোনটি নিয়ে আবার শ্বশুর বাড়ির দিকে রওনা দেন। তিনি দোকান থেকে বের হওয়ার পরপরই গুলির শব্দ আসে।রবিন বলেন, গুলির শব্দের সময় তিনি চায়ের কাপ ধুচ্ছিলেন। তিনি দেখেন, আলিফ মাটিতে পড়ে আছেন। আর লোক দুজন সেখানেই। তখন তিনি ভয়ে দোকানের পেছনের অংশে তাঁর বাসার ভেতরে ঢুকে যান।রবিন রাংসার কাছে জানতে চেয়েছিলাম লোক দুজনকে তিনি চেনেন কি না। তিনি বললেন, আলিফের সঙ্গে দেখা করতে নানা জায়গা থেকে মানুষ আসত। বেশির ভাগ মানুষ এসে তাঁর দোকানেই বসত। কিন্তু আলিফকে গুলির ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনকে আগে কখনো দেখেননি তিনি।সাংবাদিক আলিফের বাড়ি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনঞ্জিয়া গ্রামে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন আলিফ। পাশাপাশি চালাতেন ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজ।আলিফ সীমান্তের চোরাচালান, মাদক, অস্ত্র এবং স্থানীয় অন্যায়-অনিয়ম নিয়ে লিখতেন। ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতেন। পুলিশ ও পরিবার বলছে, তাঁকে আগেও দুই দফা হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রাণভয়ে তিনি থাকতেন শ্বশুরবাড়িতে। সেখানে গিয়ে তাঁকে খুন করে সন্ত্রাসীরা। তাঁর মাথা, গলা ও বুকে ছয়টি গুলির আঘাত পাওয়া যায়।ঘটনার পরদিন আলিফের স্ত্রী খাদিজা মামলা করেন। মামলায় সাত থেকে আটজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পুলিশ বলছে, আলিফ হত্যার ঘটনায় সন্দেহের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন তাজুল ইসলাম (৪৮) ও শামীম আহমেদ ওরফে ‘শুটার শামীম’ (৩২) নামের দুজন ব্যক্তি। সীমান্তের অবৈধ ব্যবসায় তাঁদের পৃথক সহযোগী দল রয়েছে। কখনো তাঁরা একসঙ্গেও কাজ করেন। আলিফকে হত্যার পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং হামলাকারীদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।রবিন রাংসার দোকান থেকে আলিফের শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব ৩০০ গজের মতো। রবিনের সঙ্গে কথা শেষ করে আমরা গেলাম আলিফের শ্বশুরবাড়ি। দেখা গেল, আলিফ থাকতেন টিনের বেড়ার একটি ঝুপড়ি ঘরে। ঘরটিতে পুরোনো আসবাব ও ব্যবহার্য জিনিসপত্রের মধ্যে তাঁর নীল রঙের এক জোড়া জুতা (কেডস) দেখা গেল। বহুদিনের ব্যবহারে তা বিবর্ণ হয়ে গেছে। শার্ট, ডেনিম (জিনস্নামে পরিচিত) প্যান্ট ও একটি ব্লেজারও রয়েছে। সেগুলোর রংও ফিকে হয়ে গেছে।আলিফের স্ত্রীর নাম খাদিজা আক্তার। গারো সম্প্রদায়ের এই নারীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল আলিফের সঙ্গে। বিয়ের সময় তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম ছিল আনন্দিতা সাংমা।আলিফ স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে যে ঘরে থাকতেন, সেখানেই পাওয়া গেল খাদিজাকে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে তিনি বুঝতে পারেননি যে গুলি হয়েছে। শুনে মনে করেছিলেন পটকার শব্দ। তাঁর এক প্রতিবেশী তাঁকে জানান যে, আলিফকে গুলি করা হয়েছে। শুনে তিনি দৌড়ে যান।খাদিজা আরও বলেন, গিয়েই তিনি আলিফের মাথাটি কোলে তুলে নেন। হৃৎস্পন্দন আছে কি না, তা পরীক্ষা করেন। তিনি যেহেতু নার্সিংয়ে পড়েছেন, সেহেতু বুঝতে পারেন যে তাঁর স্বামী আর নেই। তিনি সেখানেই বসেছিলেন। কিছু সময় পরে পুলিশ আসে।কথা বলার সময় খাদিজা কাঁদছিলেন। বলছিলেন, আগামী মাস নভেম্বরেই তাঁদের ঢাকায় চলে যাওয়ার কথা ছিল। তাঁর (খাদিজা) মা এ জন্য ৪০ হাজার টাকা ঋণও করেছিলেন। তার আগেই আলিফ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।সীমান্তে অপরাধনেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর পাশাপাশি দুই উপজেলা। এই দুই উপজেলার সঙ্গে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত। সীমান্তে মাদক, চিনি, প্রসাধন, কম্বল, গরু, যন্ত্রাংশ, আগ্নেয়াস্ত্র ইত্যাদি চোরাচালান হয়।পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, দুর্গাপুর উপজেলা সীমান্তের একাংশের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করেন শামীম আহমেদ। অন্যদিকে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন তাজুল। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ এবং চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে।শামীম ও তাজুলের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র, মাদক, বিস্ফোরক, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ পাওয়া যায়।শামীমের বিরুদ্ধে অন্তত ২৫টি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল সময়ে দুর্গাপুর থানায় এসব মামলা করা হয়। এর মধ্যে ১১টিতে হত্যাচেষ্টার ধারা রয়েছে। ১৯টি মামলা এখনো চলমান।শামীমের বিরুদ্ধে দুটি হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা নিহত হন। তাঁর বোন শামীমকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন। ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বিরিশিরি ইউনিয়নের নলজোরা গ্রামের মজিবুর রহমান ওরফে ‘দা মজিবুর’ হত্যার ঘটনায়ও তাঁর ছেলে শামীমকে প্রধান আসামি করেন।অন্যদিকে তাজুলের বিরুদ্ধে মামলা পাওয়া গেছে অন্তত ১৩টি। এর মধ্যে ১০টি দুর্গাপুর থানার। কলমাকান্দা, নেত্রকোনা সদর ও ঢাকার দারুস সালাম থানায় একটি করে মামলা রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০০৬ থেকে ২০২২ সাল সময়ে করা এসব মামলার তিনটি হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এবং চারটিতে অস্ত্র আইনের ধারা রয়েছে।আলিফ বিভিন্ন সময় শামীম ও তাজুলকে নিয়ে লিখেছেন। তাঁকে চেনেন এবং তাঁর সম্পর্কে জানেন এমন অন্তত পাঁচ ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেছেন, ফেসবুকে অন্যায়-অপরাধের ঘটনা প্রকাশে তাঁর মধ্যে একধরনের একরোখা মনোভাব ছিল। কেউ হুমকি দিয়ে বা চাপ প্রয়োগ করে তাঁর দেওয়া পোস্ট সরাতে বাধ্য করতে পারতেন না।আলিফের লেখালেখির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল তাঁর ফেসবুক পেজ। তাঁর স্ত্রী খাদিজা বলেন, তথ্য সংগ্রহের জন্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কাছাকাছিও যেতেন আলিফ। সীমান্ত দিয়ে কী আসে, কীভাবে আসে, কারা নিয়ন্ত্রণ করেন—এসব বুঝতে চোরাকারবারিদের সঙ্গে মিশতেন তিনি। শ্রমিকের বেশে কাজও করেছেন। দুর্গাপুর ও কলমাকান্দায় নদী থেকে অবৈধভাবে বালু-পাথর তোলায় জড়িত ব্যক্তিদের নামও বিভিন্ন সময় প্রকাশ করেছিলেন তিনি।খাদিজা বলেন, তাজুলের চোরাচালান ও অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য পেয়ে আলিফ তা র‍্যাবকে দিয়েছিলেন। বছর চারেক আগে তাজুলকে র‍্যাব গ্রেপ্তার করে।খাদিজার দাবির সঙ্গে কিছুটা মিল পাওয়া যায় দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদের কথায়। তিনি গত শুক্রবার দুর্গাপুর থানায় নিজ কার্যালয়ে প্রথম আলোকে বলেন, তাজুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য পেয়েছিলেন আলিফ। তাঁর (তাজুল) বাড়িঘরের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন। তাজুল মনে করতেন, তাঁর কাছে থাকা অস্ত্রের তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়েছেন আলিফ। এ নিয়ে ক্ষোভ থেকে আগেও আলিফের ওপর হামলা হয়েছিল।লুৎফুজ্জামান আলিফআলিফের লেখালেখিতে শামীমের নামও আসত। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, হত্যার সপ্তাহখানেক আগে শামীমের ইয়াবা সেবনের দৃশ্য বলে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন আলিফ। ওই ভিডিও প্রকাশের পর কোনো নতুন হুমকি এসেছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।হত্যার আগের দিন ১৪ অক্টোবর, ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পেজে আলিফ একটি সংক্ষিপ্ত পোস্ট দেন। তাতে পরদিন অপরাধের একজন ‘গডফাদার’ সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ প্রকাশের ঘোষণা ছিল। ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৮ মিনিটে একই পেজে ৪১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে নেত্রকোনায় রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে বাবুল নামে একজনের ভূমিকার অভিযোগ তোলা হয়।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই দুই পোস্টের সঙ্গে হত্যার তাৎক্ষণিক কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।হুমকি, মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনপরিবারের অভিযোগ, আলিফকে থামানোর চেষ্টা শুধু হুমকির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।আলিফের স্ত্রী খাদিজা বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন পুলিশ সুপার ফয়েজ আহমেদকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন আলিফ। সেখানে পরদিন আরও তথ্য প্রকাশের কথা ছিল। পরদিনই গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে আলিফকে আটক করে নিয়ে যায়।পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ আলিফকে মারধর করেছিল। ফলে তাঁকে হাসপাতালে নিতে হয়। আদালতে হাজির করার সময়ও তিনি ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না।ফয়েজ আহমেদ খুলনায় কর্মরত। তিনি শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ঘটনাটি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। তিনি শুধু সেদিন নয়, এর আগেও বহুবার এসপিসহ অনেকের বিরুদ্ধে লিখেছেন। সেদিন তাঁকে ধর্ষণ মামলার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়।ওই সময় আটক করার পর আলিফের বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির এবং আরেকটি ধর্ষণের মামলা দেওয়া হয়। প্রথম আলোর হাতে আসা নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল কলমাকান্দা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি হয়। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল পুলিশ মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।আলিফের স্ত্রী খাদিজা বলেন, আলিফকে হয়রানি করতেই মামলাটি করা হয়েছিল। সীমান্তে চোরাচালান নিয়ে লেখার পর অলি আহমেদ নামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতাও তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।কারাগারে থাকাকালেও আলিফের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ছিল বলে দাবি করেন খাদিজা। তাঁর অভিযোগ, কারাগারের ভেতরে লোক দিয়ে বিষ প্রয়োগ করে আলিফকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন তাজুল। এ-সংক্রান্ত কথোপকথনের রেকর্ড আলিফের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়েছিল।ফেসবুকেও আলিফের বিরুদ্ধে প্রচার চলত। ‘রিভার্স’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক পোস্ট দেওয়া হতো। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পেজটির বিরুদ্ধে মাস দুয়েক আগে সুনাম ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন আলিফ।‘আলিফ ভেবে পুলিশ কর্মকর্তাকে খুন’আলিফকে হত্যার আগের চেষ্টাগুলোর মধ্যে একটি ঘটনায় প্রাণ হারান পুলিশের একজন উপপরিদর্শক। তাঁর নাম মো. শফিকুল ইসলাম। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্গাপুর পৌরসভার পানমহাল এলাকায় তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিলেন আলিফ।মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) নেত্রকোনার পরিদর্শক মো. ইমদাদুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার দুই আসামি সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব (২১) ও মো. বাকী বিল্লাহ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁরা জানান, আলিফকে হত্যা করতে গিয়ে ভুল করে শফিকুলকে হত্যা করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দেশ দিয়েছিলেন তাজুল। অপূর্ব ও বাকি বিল্লাহ জামিনে ছিলেন। তাঁরা আলিফ হত্যায় জড়িত বলে মনে করছে পুলিশ।এর প্রায় ১০ মাস পর ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনায় দুজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন তিনি। দুই আসামি সামিউল হক ওরফে সৌরভ ও মো. ইমন মিয়া জামিনে রয়েছেন। মামলাটিতে গত মাস সেপ্টেম্বরে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তাঁরাও এবারের হামলায় অংশ নিয়েছেন বলে সন্দেহ পুলিশের।২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় সভায় নিজের জীবনের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন আলিফ। অস্ত্রধারীরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে—এমন বার্তা পাওয়ার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘আমি গেলে গুলি করবে।’ সেই সভায় সীমান্তের সশস্ত্র অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন তিনি।এখন তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগের হামলার সঙ্গে এবারের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। আগের হামলায় যুক্ত কয়েকজন আলিফ হত্যায় অংশ নিয়েছেন বলে তদন্তে উঠে আসছে।পুরোনো তালিকার পাঁচ নামদুর্গাপুর থানা-পুলিশের তালিকায় ২২ সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। আলিফ হত্যায় এখন পর্যন্ত ওই তালিকার ছয়জনের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসছে বলে জানিয়েছে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তাঁরা হলেন তাজুল ইসলাম, সাজিবুল ইসলাম অপূর্ব, মো. আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণ (১৯), মো. সাব্বির হোসেন (২০), বাকী বিল্লাহ (২০) ও সামিউল হক ওরফে সৌরভ। এই ছয়জনের চারজনই আগের হামলায় জড়িত।পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, আলিফ হত্যায় তাজুলের সহযোগীদের পাশাপাশি শামীমের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের যোগাযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডে তাজুল পরিকল্পনা এবং শামীম অর্থায়নে জড়িত ছিলেন, এমন তথ্য পেয়েছেন তাঁরা।আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন দুজন—সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণ। পুলিশের ভাষ্য, অপূর্ব তাজুলের সহযোগী। তাজুল ও তাঁর সহযোগীদের অস্ত্রের একটি অংশ থাকত অপূর্বর কাছে। প্রাঙ্গণ শামীমের সহযোগী এবং তাঁর চাচাতো বোনের ছেলে। তাঁকে এসআরবি-১৪ (আগের র‍্যাব) গ্রেপ্তার করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গুলির ঘটনার পর শামীমের সঙ্গে প্রাঙ্গণের যোগাযোগ হয়েছিল। আলিফের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে কি না, তখন তা জানার চেষ্টা হয়। প্রাঙ্গণ স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত।হত্যার আগে-পরে অন্তত দুটি সন্দেহজনক মোটরসাইকেলের গতিবিধি পর্যালোচনা করছেন তদন্তকারীরা। দোকানে দুজন অপরিচিত ব্যক্তির বাইরে ঘটনাস্থল ও আশপাশে আরও লোক ছিলেন বলে তাঁদের ধারণা। পুলিশ বলছে, সাত থেকে আটজন এই হত্যায় জড়িত।  ওসি খন্দকার শাকের আহমদ বলেন, আলিফ হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধ্যায় তাজুলের মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন ইমন। সৌরভ নামের আরেক সহযোগীও সেখানে ছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের অবস্থান ও ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে।অস্ত্রের উৎসও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, আলিফ হত্যায় ব্যবহৃত গুলি ৯ মিলিমিটারের।শামীমের ভাই চেয়ারম্যানআলিফের শ্বশুরবাড়ি দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নে। শামীমের বাড়ি পাশের কুল্লাগড়া ইউনিয়নে। আলিফ হত্যার পর থেকে শামীম ও তাঁর সহযোগীরা আত্মগোপনে রয়েছেন।শামীম দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়ালের সৎভাই। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, শামীম আগে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত মানু মজুমদারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর ব্যবসার শুরু সুদে টাকা খাটানো দিয়ে—এলাকায় এমন প্রচার রয়েছে। পরে বালু-পাথর ও সীমান্তের অবৈধ ব্যবসায় তাঁর নাম আসে।অভিযোগের বিষয়ে শামীমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর সৎভাই আবদুল আউয়াল বলেন, শামীম গৃহস্থালি ও মাছের ব্যবসা করেন। আগে বালু ও পাথরের ব্যবসা করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর নামে বদনাম করছে। তাঁর দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শামীমের নামে একটি মামলা হয়েছে। সেই মামলার বাদী সমঝোতার চেষ্টা করছেন। তবে তাজুল আওয়ামী লীগ করতেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।সীমান্তের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে শামীমসহ তাঁদের পরিবারের নাম কেন আসে—এ প্রশ্নে আবদুল আউয়াল বলেন, এসব অন্যরা করে, নাম হয় তাঁদের। এলাকার মানুষ থানায় যাওয়ার আগে তাঁর কাছে আসতে বাধ্য হন—এ অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। বলেন, মানুষ ভয় পেয়ে নয়, এমনিতেই তাঁর কাছে আসে।তাজুলের বাড়ি দুর্গাপুর পৌরসভার বাগিচাপাড়া এলাকায়। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন।তদন্ত কত দূরখবর প্রকাশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অপরাধের বিভিন্ন তথ্য দিতেন আলিফ। ১১ অক্টোবর নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন তিনি। তখন জানিয়েছিলেন, অপরাধবিষয়ক একটি ‘বড় কাজ’ করছেন তিনি।তরিকুল ইসলাম শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের কোনো সহযোগিতা লাগলে জানাতে বলা হয়েছিল আলিফকে। তিনি বলেছিলেন, আপাতত কোনো সমস্যা নেই। প্রয়োজন হলে বলবেন। তিনি বলেন, ‘সেই বড় কাজটা কী ছিল, এখন আমরা সেটি খুঁজছি। পাশাপাশি এর নেপথ্যে অন্য কিছু আছে কি না, সেটা দেখছি।’পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘কিলার গ্রুপটি মোটামুটি পরিষ্কার। এই গ্রুপ যারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের সম্পৃক্ততা খোঁজা হচ্ছে। দুজনকে ধরা হয়েছে, তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে দ্রুত একটা রেজাল্ট দিতে পারব।’পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের দিন সিগারেট কেনার সময় কার সঙ্গে যেন উত্তেজিত স্বরে কথা বলছিলেন আলিফ। তদন্তের ক্ষেত্রে সেটাও মাথায় রাখা হচ্ছে।আলিফ হত্যার ঘটনায় জেলা পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থাকেও যুক্ত করা হয়েছে। আলিফের মুঠোফোনটি ফরেনসিক করার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানো হয়েছে।পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। শিগগিরই বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।এত ভালো মানুষ হয় নানেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলায় গারো, হাজংসহ কয়েকটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে। দুর্গাপুরের বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলনজিয়া গ্রামটির (আলিফের শ্বশুরবাড়ি) বাসিন্দাদের বেশির ভাগই গারো সম্প্রদায়ের।আলিফের শ্বশুরপক্ষের আত্মীয়রা বলছেন, তিনি সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলতেন। পরিবার ও সম্প্রদায়ের সদস্যরা তাঁকে নিজেদের লোক বলেই মনে করতেন।আলিফের শাশুড়ি শিলা সাংমা ও শ্বশুর প্রয়াত ফিলিপ রেমার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের মধ্যে আলিফের স্ত্রী বড়। আলিফকে ‘বাবু’ বলে ডাকতেন শাশুড়ি শিলা সাংমা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সে আমার ছেলে ছিল। এত ভালো মানুষ হয় না।’জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দুর্গাপুর সীমান্তের অপরাধীরা দল পাল্টেছে। অপরাধ চলছে। সেই অপরাধের খবর ‘প্রকাশ করতে’ গিয়ে গত বছরই দুই দফা হামলার শিকার হয়েছেন আলিফ। তৃতীয় দফায় ছয়টি গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশ কী করেছে?স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনউদ্যোগের আহ্বায়ক ও নেত্রকোনার মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক জেলা কমান্ডার হায়দার জাহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংবাদিক আলিফকে যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, তাতে আমরা স্তম্ভিত। জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারলে এসব ঘটনা ঘটতেই থাকবে।’ তিনি বলেন, সীমান্তে কারা এসব অপরাধে জড়িত, সে তথ্য অবশ্যই পুলিশের কাছে আছে। এসব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হোক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা