রাহাদ সুমন,বরিশাল ব্যুরো :
ছয়লেন মহাসড়কের দাবিতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের গৌরনদী উপজেলার ভূরঘাটা বাসটার্মিনাল থেকে ইল্লা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার মহাসড়কজুড়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এসময় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। বিক্ষোভে এলাকাবাসীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে অবরোধের ফলে আটকে পরা যানবাহনের চালক, স্টাফ ও যাত্রীরাও অংশগ্রহণ করেন।
শুক্রবার (২৬ জুন) বাদ জুম্মা গৌরনদীর খাঞ্জাপুর ইউনিয়নবাসীর ব্যানারে “নিরাপদ সড়ক চাই, জীবন বাঁচাতে ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ছয়লেন মহাসড়ক চাই” শ্লোগানকে সামনে রেখে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কর্মসূচিতে জুম্মার নামাজের পর মহাসড়কের পাশের বিভিন্ন মসজিদের মুসুল্লীগণ স্ব-স্ব এলাকায় মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও কর্মসূচিতে বরিশালের গৌরনদী ও উজিরপুর উপজেলা এবং মাদারীপুরের কালকিনিসহ বিভিন্ন উপজেলার সচেতন জনগন স্বর্তস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এসময় মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছয়লেন মহাসড়কের পক্ষে বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি সম্বলিত ফেস্টুন ও প্লাকার্ড শোভা পায়।
প্রায় দুইঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন চলাকালীন মহাসড়ক দিয়ে বরিশালের প্রবেশদ্বার গৌরনদীর ভূরঘাটা বাস টার্মিনালে আলোচনা সভায় অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তারা গত ২৩ জুন মহাসড়কের গৌরনদীর খাঞ্জাপুরের বটতলা এলাকায় মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত কুয়েত প্রবাসী সোহেল ফকিরের (২৪) হত্যাকারী ঘাতক পরিবহনের চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
অনুষ্ঠিত সভায় সংগঠক কাজী সুজন তার বক্তব্যে বলেন, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের প্রধান ধমনী। পদ্মা সেতু চালুর পর এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে বর্তমানের দুই লেনের সরু এই মহাসড়কটি এখন আর পর্যাপ্ত নয়।
তিনি জনগুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি দ্রুত ছয়লেনে উন্নত করার দাবি জানিয়ে আরও বলেন, মহাসড়কের ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কটি ছয়লেনে উন্নতি করা হলে তীব্র যানজট নিরসন, সময় সাশ্রয় ও দুর্ঘটনা কমে আসবে। কারণ পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষ অত্যন্ত কম সময়ে তাদের গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারছেন। কিন্তু ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের সরু রাস্তার কারণে ফেরিঘাটের আগের যানজট এখন মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যেমন- ভাঙ্গা, টেকেরহাট, মোস্তফাপুর, ভুরঘাটা, গৌরনদী, টরকী, বাটাজোরসহ বিভিন্নস্থানে এসে স্থানান্তরিত হয়েছে। রাস্তাটি ছয়লেনে উন্নীত হলে যানবাহনের গতি বাড়ার পাশাপাশি যাতায়াতের সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।
খাঞ্জাপুর এলাকার যুব প্রতিনিধি আতিক মৃধা বলেন, বর্তমান দুই লেনের সরু রাস্তায় ছোট-বড় সবধরনের গাড়ি একইসাথে চলাচল করছে। দূরপাল্লার দ্রুতগতির বাসের পাশাপাশি নসিমন, করিমন, ইজিবাইকের মতো ধীরগতির স্থানীয় যানবাহন একই লেনে চলাচল করায় প্রতিনিয়ত ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ বা ওভারটেকিংয়ের কারণে দুর্ঘটনা লেগেই রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ছয়লেনের মহাসড়ক নির্মিত হলে ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের (সার্ভিস লেন) ব্যবস্থা থাকবে, যা সড়ক দুর্ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে।
সমাজ সেবক মো. পান্নু মৃধা বলেন, বরিশাল বিভাগে প্রচুর পরিমাণে কৃষিপণ্য, মাছ এবং পোল্ট্রি উৎপাদিত হয়। সড়ক সরু ও যানজট থাকার কারণে এই পচনশীল পণ্যগুলো সময়মতো ঢাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পরে। ছয়লেন মহাসড়ক হলে কৃষকরা তাদের পণ্যের সঠিক মূল্য পাবেন। পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর ও মোংলা বন্দরের পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত ও সহজ হবে। তেমনি দক্ষিণাঞ্চলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
চাকরিজীবী ফেরদাউস হোসেন সোহাগ বলেন, দেশের সর্বদক্ষিণের কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, গুঠিয়া মসজিদ, দুর্গাসাগর দীঘি বা ভাসমান পেয়ারা বাজারের মতো অসংখ্য পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে বরিশাল অঞ্চলে। শুধুমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা আরামদায়ক এবং যানজটমুক্ত না হওয়ায় অনেক পর্যটকই এই অঞ্চলে ভ্রমণ করতে চায় না। যেকারণে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সরু মহাসড়কটি ছয়লেন হলে পর্যটনখাতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটবে।
খাঞ্জাপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য ছোটন হাওলাদার বলেন, শুধু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল এবং নিরাপদ করতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কটি চারলেনের মূল সড়ক ও দুই পাশে দুটি সার্ভিস লেনসহ মোট ছয়লেনে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন-সমাজ সেবক এমারাত সরদার, জুয়েল হাওলাদার, মাইনুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দরা।
বক্তারা অনতিবিলম্বে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙা থেকে সাগরকন্যা কুয়াকাটা পর্যন্ত দুইলেনের সরু মহাসড়ক ছয়লেনে উন্নতি করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অনতিবিলম্বে তাদের এ দাবি পূরণ না হলে ভবিষ্যতে বড়ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও উল্লেখ করেন। সবশেষে ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ডের মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়।
প্রায় আধাঘন্টাব্যাপী মহাসড়ক অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয়পাশে শত শত যানবাহন আটকা পরে। এসময় বিক্ষোভে এলাকাবাসীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে অবরোধের ফলে আটকে পরা যানবাহনের চালক, স্টাফ ও যাত্রীরা অংশগ্রহণ করে অনতিবিলম্বে ছয়লেন মহাসড়ক নির্মানের দাবি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।