• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৯ অপরাহ্ন
Headline

কাউকে নিজের অসুস্থতার কথা আগে জানানো কি ভদ্রতা, নাকি অভদ্রতা

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পরিবারের ছোট্ট শিশুটির কাশি হয়েছে। কাশির খবর সে মাকে বলছে এভাবে।‘মা? মনে হচ্ছে গলার মধ্যে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে!’এই চরম নাটকীয় কথাটা বলার পরই শিশুটি যা করল, সেটা বোধ হয় শুধু শিশুরাই পারে। সে সোজা তার মায়ের মুখের ওপর খুক খুক করে কেশে দিল! ঘটনাটা ঘটেছিল এই পরিবারের দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করা এক পারিবারিক ভ্রমণের ঠিক তিন দিন আগে। বহু দিন পর তারা কিছু আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে অন্য শহরে যাচ্ছিল। কিন্তু মেয়ের কাশির সেই মিহি পানির কণাগুলো যখনই মায়ের মুখে এসে লাগল, মা তখনই বুঝে গিয়েছিলেন, কপাল পুড়েছে! তিনি, তাঁর মেয়ে, তাঁদের পরিবার, এমনকি যাঁদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, তাঁরা সবাই এখন বিপদে আছেন।দুই দিন পর ওই মায়েরও মনে হতে লাগল, কেউ যেন তার গলার ভেতর আগুন ধরিয়ে দিয়েছে! মেয়ে হয়তো একটু বেশিই নাটকীয়তা করেছিল, কিন্তু সে মোটেও ভুল বলেনি।গল্পের এই মায়ের মতোই ঠান্ডা-জ্বরের সিজনগুলো আমাদের সবার সামনেই সব সময় একটা দারুণ শিষ্টাচারের সংকট তৈরি করে। অসুস্থ হওয়া তো আর কোনো অপরাধ বা সামাজিক পাপ নয়, এটা মানুষের জীবনযাপনের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু কারও সঙ্গে দেখা করার আগে তুমি যে অসুস্থ, সেটা না জানানো কি সত্যিই খুব অভদ্রতা? চলো, এই বিষয় নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।যে শহরে বিনা মূল্যে খাবার পাওয়া যায়এ সময় অনেকেই সর্দি–কাশি, নাক বন্ধ ইত্যাদি সমস্যায় ভোগেনকেন বলা উচিত তুমি অসুস্থতুমি অসুস্থ, এটা অন্যদের জানানোর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। তুমি সাধারণ সুস্থ মানুষদের জন্য যেমন একটা বিপদের কারণ হতে পারো, তেমনি গর্ভবতী নারী, খুব বয়স্ক মানুষ, ছোট শিশু বা যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের জন্য তোমার ওই একটুখানি সর্দিও কিন্তু মারাত্মক হতে পারে। তাদের না জানিয়ে দেখা করলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।হয়তো ওই মানুষগুলোর সামনে বিয়ে, ছুটি কাটানো বা কোনো সার্জারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, যার জন্য তাদের সুস্থ থাকাটা জরুরি। সাধারণত মানুষ আগে থেকেই ঢোল পিটিয়ে বলে বেড়ায় না যে ‘ভাই, আমার আগামী সপ্তাহে একটা আয়োজন আছে, তাই আমি কোনোভাবেই অসুস্থ হতে পারব না।’আরেকটা খুব বাস্তবসম্মত কারণও আছে। তোমাকে দেখলে এমনিতেই বোঝা যাবে যে তুমি অসুস্থ। তুমি যদি পকেটভর্তি টিস্যু নিয়ে আর ভাঙা ভাঙা গলায় কারও সঙ্গে দেখা করতে যাও, তারা ঠিকই বুঝে ফেলবে যে তুমি অসুস্থ! তখন তারা যদি বুঝতে পারে যে তুমি জেনেশুনে অসুস্থ শরীর নিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছ, তবে তারা বিরক্ত তো হবেই।আর হ্যাঁ, সেই জীবাণুবাতিক বন্ধুদের কথাও তো বলতে হয়, যাদের তুমি মনে মনে একটু বাড়াবাড়ি করছে বলেই ভাবো। তাদের হয়তো তুমি ইচ্ছা করেই কিছু জানাতে চাও না; কারণ, তারা এটা নিয়ে তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলবে। কিন্তু সত্যি বলতে, তাদেরই সবার আগে জানানো উচিত। উদ্বেগ তৈরি হয় তথ্যের অভাব থেকে। তুমি যদি আগে থেকেই তাদের সব সত্যি খুলে বলো, তবে তাদের ভয় অনেকটাই কমে যাবে।তবে মনে রেখো, তুমি অসুস্থ, এটা জানানোর মানে এই নয় যে তুমি তাদের কাছে দেখা করার অনুমতি চাইছ। তুমি শুধু বলতে পারো, ‘শোনো, সকালে উঠেই দেখি আমার মাথা ধরেছে আর একটু সর্দি লেগেছে। দেখা করার আগে ভাবলাম তোমাকে জানিয়ে রাখি। তুমি চাইলে আমরা অন্য কোনো দিন দেখা করতে পারি।’ ব্যস, হয়ে গেল! এখন তাদের কাছে তথ্য আছে, তারা যা ভালো বোঝে সিদ্ধান্ত নেবে।কিছুক্ষণ পড়ার পর মাথা ফাঁকা লাগে কেনকখন বলা উচিত নয়প্রতিটি হাঁচি-কাশিকেই অ্যালার্ম বাজিয়ে সবাইকে জানানোর কোনো মানে নেই। অতিরিক্ত তথ্য অনেক সময় শুধু খামোখাই চিন্তার কারণ হয়। বিশেষ করে যারা একটু বেশিই দুশ্চিন্তা করে, তাদের জন্য। ঠান্ডার সিজনে কারও একটু সর্দি লাগাটা মোটেও বিরল কোনো ঘটনা নয়। বাইরে বের হলে দেখবে তোমার আশপাশে আরও ১০ জন লোক নাক টানছে আর হাঁচি দিচ্ছে।সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ সব সময় বুঝতেও পারে না যে তারা কখন ছোঁয়াচে। তুমি হয়তো সকালে একদম ফ্রেশ মুডে ঘুম থেকে উঠলে, সারা দিন কাজ করলে, আর রাতে গিয়ে দেখলে তোমার গলাব্যথা করছে! হয়তো তোমার ওই নাক টানাটা শুধু অ্যালার্জির কারণে হচ্ছে, অথবা তিন সপ্তাহ আগের কোনো কাশির রেশ এখনো রয়ে গেছে, যা মোটেও ছোঁয়াচে নয়। আবার কখনো কখনো শুধু একটু বেশি ক্লান্ত লাগলেও আমরা ভাবতে শুরু করি, ‘জ্বর আসছে নাকি?’ অথচ সেটা হয়তো গত রাতে একটানা তিনটে মুভি দেখার ক্লান্তি! তাই প্রতিটি সামাজিক অনুষ্ঠানের আগে নিজেকে একদম নির্ভুলভাবে ডায়াগনোস করার আশা করাটা একটু বাড়াবাড়িই বটে।আর সবার কি সত্যিই তোমার এত ব্যক্তিগত তথ্য জানার দরকার আছে? গোপনীয়তা আজকাল খুব দামি জিনিস হয়ে গেছে। যারা একটু বেশিই শেয়ার করতে ভালোবাসে, তাদের জন্য প্রতিটি ছোটখাটো সিম্পটম সবাইকে জানিয়ে বেড়ানোটা বেশ বিরক্তিকর একটা ব্যাপার হতে পারে। মানুষ তোমার সামান্য অসুস্থতার কথা ধারাভাষ্য আকারে সবটা শুনতে চায় না!দাঁতের যত্নে যে কাজগুলো করতেই হবেকীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, অসুস্থতার কথা জানাবে কি নাকারও সঙ্গে দেখা করার আগে তুমি অসুস্থ কি না, তা জানানোর সবচেয়ে ভালো শিষ্টাচার হলো পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু কিসের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবে?· জায়গা: তুমি কি কোনো খোলা মাঠের কনসার্ট বা খেলায় যাচ্ছ, যেখানে তোমার জীবাণুগুলো খোলা বাতাসে উড়ে যাবে? নাকি কারও বাড়ির ছোট ড্রয়িংরুমে গিয়ে তিন ঘণ্টা ধরে একই বাতাস ভাগাভাগি করবে?· অনুষ্ঠান: এটা কি কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান, যেখানে বয়স্ক মানুষ আর ছোট শিশুরা থাকবে? নাকি তুমি বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলতে যাচ্ছ?· অসুস্থতার ধরন: একটু-আধটু সর্দির সঙ্গে কিন্তু ফ্লু, কোভিড বা চরম ছোঁয়াচে অসুখের তুলনা চলে না। একটা হলো সামান্য বিরক্তি, আর অন্যগুলো মানুষকে কয়েক দিনের জন্য শয্যাশায়ী করে ফেলতে পারে।· অসুস্থ ব্যক্তিটি কে: যদি অসুস্থ ব্যক্তিটি কোনো শিশু হয়, তবে পুরো হিসাবটাই পাল্টে যায়। শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি অসুস্থ হয়। তারা নিজে থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পারে না। তারা তোমার চোখের ওপর হাঁচি দিতেও দ্বিধা করবে না!· তুমি কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছ: তুমি কি মাস্ক পরতে রাজি আছো? সঙ্গে অতিরিক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখছ? তোমার হাতে যতটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে, ততটুকু দিয়ে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করলে তা সম্পর্কের জন্য দারুণ কাজে দেয়।তবে অনেকেই ভাবেন, ‘যেহেতু আমি কথা দিয়ে ফেলেছি, তাই মরে গেলেও আমাকে সেখানে যেতে হবে!’ অসুস্থ হয়ে দেখা করার চেয়ে কথা না রাখাটা তাদের কাছে বড় অপরাধ মনে হয়। কিন্তু সত্যি বলতে, তোমার বন্ধু বা হোস্ট তোমার জীবাণু গ্রহণের চেয়ে তোমার ওই ‘না’ বলাটাকেই বেশি পছন্দ করবেন!জীবনরক্ষায় স্মার্টফোনের যে ফিচারগুলো চালু রাখতে হবেতাহলে আসলে কী বলা উচিতবিষয়টা একদম সহজ রাখো। তাদের কোনো মেডিক্যাল রিসার্চ পেপার পাঠানোর দরকার নেই।· সামান্য অসুস্থ হলে: ‘আজ সকালে উঠেই দেখি আমার একটু ঠান্ডা লেগেছে। আমি অবশ্য ঠিকই আছি, তবে ভাবলাম দেখা করার আগে তোমাকে জানিয়ে রাখি। তুমি চাইলে আমরা প্ল্যানটা বাতিল করতে পারি, কোনো সমস্যা নেই।’· শিওর না হলে: ‘আজ আমার গলাটা একটু খুসখুস করছে, বুঝতে পারছি না সর্দি হবে কি না। এমনিতে আমি একদম ফিট, তবু ভাবলাম তোমাকে একটু জানিয়ে রাখি।’· পুরোপুরি অসুস্থ হলে: ‘বন্ধু, আমি তো পুরোপুরি বিছানায় পড়েছি। আমার মনে হয় আমাদের অন্য কোনো দিন দেখা করা উচিত। রিয়েলি সরি, আমি দেখা করার জন্য খুব ওয়েট করছিলাম।’খেয়াল করে দেখো, এই তিন ধরনের মেসেজেই কিন্তু তুমি অন্যজনের ওপর কোনো চাপ দিচ্ছ না। তুমি শুধু তথ্যটা দিচ্ছ, বাকি সিদ্ধান্ত তাদের।তুমি গিয়ে যদি দেখো অন্য কেউ অসুস্থতখন তোমার নিজের হিসাব নিজেকেই মেলাতে হবে। তুমি যদি কোনো কারণে অস্বস্তি অনুভব করো, তবে অনায়াসেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করার কথা বলতে পারো বা ওখান থেকে চলে আসতে পারো। এর জন্য কোনো নাটকীয় ঘোষণার দরকার নেই। খুব সুন্দর করে বলতে পারো, ‘আমি আসলে এই মুহূর্তে কোনোভাবেই অসুস্থ হতে চাইছি না। তুমি কিছু মনে না করলে আমরা কি অন্য কোনো দিন দেখা করতে পারি?’শেষ কথাগল্পের ওই মা এবং তার পরিবার কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রিপ বাতিল করেনি। তারা যাওয়ার আগেই তাদের আত্মীয়দের সব সত্যি খুলে বলেছিল। আত্মীয়রা খবরটা শুনে খুব একটা খুশি না হলেও দেখা করতে চেয়েছিল। তাই তারা প্লেনে এবং পাবলিক জায়গাগুলোতে মাস্ক পরেছিল, আত্মীয়দের বাড়িতে না থেকে একটা হোটেলে উঠেছিল এবং বেশ কিছু ঘরের ভেতরকার আড্ডা ঘরের বাইরে বের করে নিয়েছিল। আর এতেই ভ্রমণটা দারুণ হয়েছিল। কারণ, কেউ তাদের অসুস্থ দেখে অবাক হয়নি।হ্যাঁ, তুমি যদি এমন কোনো অসুখে ভোগো, যা শুনলে অন্য কেউ হয়তো তোমার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্তটা বদলে ফেলতে পারে—তবে সেটা আগে থেকে না জানানোটা অবশ্যই অভদ্রতা। শিষ্টাচার আসলে তুমি অসুস্থ কি না, সেটার ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে তুমি অন্যদের কতটুকু তথ্য দিচ্ছ, যার ওপর ভিত্তি করে তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে তারা তাদের বিকেলটা তোমার এবং তোমার শরীরে বয়ে বেড়ানো আণুবীক্ষণিক অতিথিদের সঙ্গে কাটাতে চায় কি না!হাত ধোয়ার সঠিক নিয়ম


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা