রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান। বিলাসবহুল ভবন, নামিদামি প্রতিষ্ঠান আর কড়া নিরাপত্তার আড়ালে এখানকার কিছু স্পা সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন। বৈধ স্পা, বিউটি পার্লার কিংবা ম্যাসাজ সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক, তরুণীদের শোষণ এবং গ্রাহকদের ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অভিযোগের কথা বলছেন স্থানীয়রা।অনুসন্ধানে গুলশান-১ এলাকায় এমনই একটি স্পা সেন্টারের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে শাহ আলম ও রাজু ওরফে ‘টুনটু রাজু’র নাম স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে তরুণীদের চাকরির প্রলোভনে এনে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা, মাদক সরবরাহ ও সেবনের সুযোগ তৈরি করা এবং গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে গ্রাহকদের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা।তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই এবং আইনগতভাবে প্রমাণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ওপর নির্ভরশীল।দরজার বাইরে নীরবতা, ভেতরে রহস্য,গুলশান-১-এ রবি টাওয়ারের পাশের একটি ভবনে অবস্থিত বলে জানা গেছে কথিত ওই স্পা সেন্টারটি। লিফটে পঞ্চম তলায় নেমে সিঁড়ি দিয়ে এক ধাপ নিচে গেলেই দেখা মেলে এর প্রবেশপথের।বাইরে থেকে সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো দৃশ্যমান না হলেও প্রবেশপথে রয়েছে কেঁচি গেট ও শক্ত কাঠের দরজা। অভিযোগ রয়েছে, দরজার বাইরে থাকা সিসিটিভির মাধ্যমে আগত ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরিচিত বা নিশ্চিত গ্রাহক ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না বলেও স্থানীয়দের দাবি।
প্রশ্ন উঠছে,একটি সাধারণ স্পা সেন্টারের প্রবেশপথে এমন কঠোর গোপনীয়তার প্রয়োজন কেন?তরুণীদের নিয়ে ভয়ংকর অভিযোগ,স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণীদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আনা হয়। পরে তাদের কথিত ম্যাসাজ সার্ভিসের পাশাপাশি অনৈতিক কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।অভিযোগ রয়েছে, অর্থের প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে অনেক তরুণীকে এই চক্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানোর ভয়, সামাজিকভাবে হেয় করার ভয় কিংবা নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো ভুক্তভোগীর লিখিত বক্তব্য বা নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।মাদকের অভিযোগ নজরদারি কোথায়?শুধু অনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মাদকসেবন ও মাদক সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি কোনো স্পা সেন্টারে নিয়মিত মাদক সেবন বা বিক্রির ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কোথায়?সাম্প্রতিক সময়েও গুলশানের বিভিন্ন স্পা সেন্টারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিটি করপোরেশনের অভিযান এবং আটকের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।তাহলে অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও লাইসেন্স যাচাই হচ্ছে কি না এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।গোপন ক্যামেরা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল?অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে গোপন ক্যামেরা ঘিরে।অভিযোগ রয়েছে, স্পা সেন্টারের বিভিন্ন কক্ষে গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করা হয়। পরে এসব ভিডিও ব্যবহার করে বিত্তশালী গ্রাহকদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নয়; বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, চাঁদাবাজি ও সাইবার অপরাধের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নও তৈরি করে।তাই সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত কথিত সিসিটিভি ও ডিজিটাল ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা।সব ম্যানেজ’কারা সেই প্রভাবশালী মহল?স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সময় দাবি করেন পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে এবং ‘সবকিছু ম্যানেজ’ করেই ব্যবসা পরিচালনা করা হয়।এই দাবির সত্যতা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন।আসলে কি কোনো প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় রয়েছে, নাকি শুধু প্রভাব বিস্তারের জন্য পুলিশ ও রাজনীতিবিদদের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে?যদি নাম ব্যবহার করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর যদি সত্যিই কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও প্রকাশ করা দরকার।ট্রেড লাইসেন্সের আড়ালে ভিন্ন ব্যবসা?আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন?প্রতিষ্ঠানটির বৈধ ব্যবসায়িক অনুমোদন কী?ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থা ব্যবসার ধরন ও লাইসেন্সের তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যে ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নিয়েছে, বাস্তবে যদি তার বাইরে অন্য কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ ও যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।তাই শাহ আলমের কথিত স্পা সেন্টারের ট্রেড লাইসেন্সের ধরন, অনুমোদিত ব্যবসা, ভবন ব্যবহারের অনুমতি এবং বাস্তব কার্যক্রম,সবকিছু যাচাই করা প্রয়োজন।সাংবাদিক গেলেই অসহযোগিতা?তথ্য সংগ্রহের জন্য গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিষ্ঠানটির সামনে গেলে কর্মীদের পক্ষ থেকে অসহযোগিতা ও অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সাংবাদিকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করা হয়।প্রশ্ন হলো একটি বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে এত আপত্তি কেন?অবশ্য সাংবাদিকদেরও আইন ও পেশাগত নীতিমালা মেনে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একইভাবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।স্থানীয়দের প্রশ্ন?অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই কেন?স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ শোনা গেলেও কার্যকর কোনো অভিযান বা তদন্ত তাদের চোখে পড়েনি।তাদের দাবি, গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাদক, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মানবপাচার বা ব্ল্যাকমেইলের মতো অভিযোগ উঠলে সেটি দ্রুত যাচাই করা উচিত।
অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা, আর মিথ্যা হলে অভিযোগকারীদের দাবির অসত্যতা প্রকাশ দুই ক্ষেত্রেই তদন্ত প্রয়োজন।অনুসন্ধানের, দাবিস্থানীয়দের দাবি, শুধু এই একটি প্রতিষ্ঠান নয়, গুলশান-বনানীর সব স্পা ও ম্যাসাজ সেন্টারের বিষয়ে সমন্বিত অভিযান চালানো হোক।তদন্তে দেখা হোক,প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসার ধরন;ভবন ব্যবহারের অনুমোদন!কর্মরত ব্যক্তিদের বয়স ও নিয়োগের তথ্য,মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ,সিসিটিভি ও ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার,গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি;ব্ল্যাকমেইল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ,এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কি না।শাহ আলম-রাজুর বক্তব্য কী?প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে স্পা মালিক শাহ আলম ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রাজু ওরফে টুনটু রাজুর বক্তব্য নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গুলশান থানা পুলিশ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বক্তব্যও প্রয়োজন।তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।শেষ প্রশ্নটি থেকেই যায়,গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় একটি স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে যদি একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন থাকবেই এটি কি সত্যিই একটি সাধারণ স্পা সেন্টার, নাকি বৈধ ব্যবসার সাইনবোর্ডের আড়ালে চলছে অন্য কোনো ব্যবসা?আর যদি অভিযোগগুলো সত্য না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে সত্যটি পরিষ্কার করা হোক।কারণ গুলশানের অভিজাত ঠিকানার আড়ালে কোনো অপরাধচক্র গড়ে উঠলে তার দায় শুধু ব্যবসায়ীর নয়,নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।