বিশ্বকাপের পর প্রথম আন্তর্জাতিক বিরতি শুরু হয়ে গেছে। এদিকে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলেও নতুন মৌসুমের খেলা হয়ে গেছে মাসখানেকের মতো। লা লিগায় তো ম্যাচের হিসাবে মৌসুমের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পথ পাড়ি দেওয়া শেষ।তো কেমন হলো এই সময়ে জোসে মরিনিওর অধীন রিয়াল মাদ্রিদের নতুন করে পথচলা?সাত ম্যাচের পাঁচটিতে জয় এসেছে। কিলিয়ান এমবাপ্পের গোলক্ষুধা চোখ জুড়িয়েছে। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদকে তো আর বার্নাব্যুতে মালাগার মতো দলকে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় মাপা হয় না। আসল পরীক্ষা ছিল রিয়াল বেতিস ও আতলেতিকো মাদ্রিদের মাঠে। সেই কঠিন দুটি অ্যাওয়ে ম্যাচে ধাক্কা খেয়ে আবার ভেসে উঠেছে পুরোনো ক্ষত।চোটে কয়েক সপ্তাহের জন্য ছিটকে গেলেন ভালভের্দেএমন একটা নড়বড়ে সূচনা হয়তো মেনে নেওয়া যেত, যদি না চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা ঝড়ের গতিতে সবাইকে পিষে ফেলত। হান্সি ফ্লিকের অপরাজিত দলটা এরই মধ্যে চতুর্থ রিয়ালের চেয়ে ৬ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে শীর্ষে। মৌসুমের শুরুতেই মনে হচ্ছে, এ ব্যবধান ঘোচানো যেকোনো দলের জন্যই পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।নতুন চেহারা আর নতুন সাজের রিয়াল মাদ্রিদে মরিনিওর ‘মধুচন্দ্রিমা’র দিন তাই শেষই বলা যায়। এই সময়ে তাঁর দল, পারফরম্যান্স আর খেলার ধরন বিশ্লেষণ করলে কী পাওয়া যাচ্ছে, চলুন দেখা যাক।আরদা গুলের: নতুন নক্ষত্রএই মৌসুমে গুলেরের পা থেকে এসেছে ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ পাস, যা লা লিগায় যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। আরদা গুলেরের পায়ে যে জাদু আছে, তা নতুন করে বলার দরকার নেই। ২১ বছর বয়সী এ তরুণ আগের মৌসুমেই লা লিগার সেরা গোলের পুরস্কার জিতেছিলেন। চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে প্রথম লেগে পুরো আলোটাই নিজের দিকে টেনে নিয়েছিলেন।তবে ২০২৬-২৭ মৌসুমের শুরুতে নতুন কোচের পরিকল্পনায় গুলেরের জায়গা কোথায়, তা বেশ ধোঁয়াশাপূর্ণই ছিল। কারণ, ১০ নম্বর রোলে মরিনিওর প্রথম পছন্দ জুড বেলিংহাম। আর ডান উইংয়ে বড় অঙ্কের চুক্তিতে আসা ইয়ান দিওমান্দে যোগ দেওয়ায় প্রতিযোগিতা ছিল আরও বেশি।গুলের ও এমবাপ্পের উদযাপন।কিন্তু মাঠের খেলায় গুলের দেখিয়ে দিলেন নিজের গুরুত্ব। এই মৌসুমে তুর্কি এই তরুণের পা থেকে এসেছে ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ পাস, যা লা লিগায় যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। বার্সেলোনা তারকা লামিনে ইয়ামালের চেয়েও একটি বেশি, অথচ ইয়ামাল গুলেরের চেয়ে প্রায় ২৩০ মিনিট বেশি খেলেছেন।বেতনের পেছনে রিয়াল কত খরচ করতে পারবে, বার্সেলোনা কতযে রিয়াল মাদ্রিদ মাঝেমধ্যে আক্রমণের ধার হারিয়ে হাঁসফাঁস করে, সেখানে গুলেরকে রাখা আবশ্যক। তা সে ডান উইংয়েই হোক বা মাঝমাঠে।কার্লোস এস্পি: শেষ মুহূর্তের নায়করিয়ালের হয়ে লিগে মাত্র ২৫ মিনিট খেলে এস্পি এর মধ্যেই করে ফেলেছেন দুটি গোল, যা দলকে এনে দিয়েছে ৪টি মহামূল্যবান পয়েন্ট। লেভান্তে থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ ইউরোয় মাদ্রিদে যোগ দেওয়া ২১ বছরের কার্লোস এস্পির ভূমিকা নির্ধারিত ছিল শুরু থেকেই: কিলিয়ান এমবাপ্পের বেঞ্চ ব্যাকআপ।হয়তো একাদশে এস্পির নিয়মিত নামা কখনো হবে না। কিন্তু তিনি দ্রুতই হয়ে উঠছেন এক দুর্দান্ত ‘সুপারসাব’। মাত্র ২৫ মিনিট খেলে এর মধ্যেই করে ফেলেছেন দুটি গোল, যা দলকে এনে দিয়েছে ৪টি মহামূল্যবান পয়েন্ট। পয়েন্টের সংখ্যা আরও বাড়ত, যদি রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে তাঁর অসাধারণ চেষ্টাটি অফসাইডের ফাঁদে কাটা না পড়ত।রিয়ালে এস্পির মার ‘শেষ রাতে’ শারীরিক শক্তি, শূন্যে বল দখলের ক্ষমতা আর সময়মতো বক্সে হাজির হওয়ার যে সহজাত দক্ষতা এই তরুণ স্ট্রাইকারের, তা মাদ্রিদের স্কোয়াডে আর কারও নেই। সতীর্থরা তাঁকে ইতিমধ্যে ‘হোসেলু জুনিয়র’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন। ঠিক যেমন আগের মৌসুমে বেঞ্চ থেকে নেমে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতেন হোসেলু, এস্পিও যেন হাঁটছেন সেই একই পথে।দিওমান্দেকে সময় দিতে হবেমরিনিও এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ম্যাচে দিওমান্দেকে শুরুর একাদশে রেখেছেন।সবার শুরুটা অবশ্য এমন স্বপ্নের মতো হয় না। ক্লাবের সবচেয়ে দামি নতুন সংযোজন ইয়ান দিওমান্দে এখনো তাঁর নিজস্ব একটা অবিস্মরণীয় মুহূর্তের অপেক্ষায়।লাইপজিগ থেকে ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরোতে বার্নাব্যুতে আসা ১৯ বছরের এই আইভরি কোস্ট তরুণের প্রতিভা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে তিনি বর্তমানের চেয়েও বেশি আসলে ভবিষ্যতের তারকা। এখন মূলত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাবের আবহে তাঁকে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।মরিনিও এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ম্যাচে দিওমান্দেকে শুরুর একাদশে রেখেছেন। নতুন তারকাকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে থাকা সমর্থকদের এতে কিছুটা ক্ষোভ হতেই পারে।এলচের বিপক্ষে ম্যাচটিতে দেওয়া একটি অ্যাসিস্ট দিয়ে আসলে বুন্দেসলিগার সেরা উদীয়মান তারকার সামর্থ্য বোঝা যাবে না। তবে মরিনিও কাঁচা হীরা সামলাতে সব সময়ই একটু সাবধানি। তাঁর এই সাবধানতার পেছনে যুক্তিও আছে। দেড় বছর আগেই তো রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লেগানেসের হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল এই তরুণের। ১৮ মাসেই এত দূর আসা, ধাতস্থ হতে একটু সময় তো লাগতেই পারে।এমবাপ্পে-ভিনিসিয়ুস দ্বন্দ্ব: অমীমাংসিত ধাঁধামেত্রোপোলিতানোয় আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে হারের পর ফরাসি পত্রিকা ‘লেকিপ’ রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়দের গড় অবস্থানের একটি চিত্র প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, এমবাপ্পে আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র মাঠের প্রায় একই জায়গায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছেন।২০২৪-এর গ্রীষ্মে ফরাসি মহাতারকা আসার পর থেকে এ সমস্যা বয়ে বেড়াচ্ছে রিয়াল। মরিনিও এখনো তাঁর এই দুই ধারালো অস্ত্রকে একসঙ্গে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করার পথ খুঁজে পাননি।এমবাপ্পে আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সম্পর্ক উষ্ণ নয় বলে গুঞ্জন আছে। ৪-২-৩-১ ফর্মেশনের একদম সামনে দাঁড়িয়ে এমবাপ্পে গোল করছেন, ছন্দে আছেন। কিন্তু ভিনিসিয়ুস যেন তাঁর নিজের ছায়া। বিশাল অঙ্কের নতুন চুক্তিতে সই করার পর এই দৃশ্য দেখতে খুব স্বস্তিকর লাগে না। সমস্যা সমাধানের সময় এখনো পেরিয়ে যায়নি। তবে লক্ষণ যা বলছে, তাতে আরও একটি মৌসুমে কেবল সমন্বয়হীনতা আর একে অপরের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষির দৃশ্যই দেখার সম্ভাবনা বেশি।মরিনিও বদলাননিমাদ্রিদে দ্বিতীয় দফায় পা রেখেছিলেন প্রায় ১০০ দিন আগে। তখন মরিনিওর গলায় ছিল অভিজ্ঞতার বিনয়, এক পরিণত প্রবীণের সুর।মাদ্রিদে নিজের প্রথম আমলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও পুরোনো বিতর্কিত মন্তব্যের প্রসঙ্গ উঠলেই হাসিমুখে বলতেন, ‘আমি ওকথা বলেছি? সত্যিই আমি?’ ভাবখানা এমন যেন, ফুটবল বিশ্ব দেখতে যাচ্ছে এক শান্ত ‘মরিনিও ২.০’।কিন্তু সেই মুখোশ বেশি দিন টিকল না।আতলেতিকোর পক্ষে যাওয়া দুটি ফাউলের ছবি সংবাদ সম্মেলনে দেখান রিয়াল কোচ জোসে মরিনিওমৌসুমে প্রথম হারের পর এলচের ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলন শেষ করার সময় ৬৩ বছর বয়সী মরিনিও মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘পেনাল্টি নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই? বেশ অবাক করার মতো, তা-ই না?’এরপর আতলেতিকোর কাছে হারের পর একেবারে কাগজপত্র ছেপে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাজির মরিনিও। রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে কড়া সমালোচনা করলেন। প্রশ্ন তুললেন, ৪১ বছর বয়সী মিগেল আনহেল ওরতিস আরিয়াসকে কেন এমন ম্যাচের দায়িত্ব দেওয়া হলো?সংবাদ সম্মেলনে ছবি প্রিন্ট করে নিয়ে এলেন মরিনিও, রেফারিং নিয়ে অসন্তোষবার্সেলোনা আর আতলেতিকোর পক্ষে যাওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে ‘হাস্যকর’ বলতেও ছাড়েননি মরিনিও। আবারও ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়ে বলে দিলেন, ‘যদি “ওরা” আমাদের শান্তিতে কাজ করতে দেয়, তবে আমরা শিরোপার লড়াইয়ে থাকব।’তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করলেন, ‘এখনো অনেকটা পথ বাকি।’হ্যাঁ, মিস্টার মরিনিও, সত্যিই অনেকটা পথ বাকি।মাদ্রিদের সেরা মাঝমাঠ কোনটা?গ্রীষ্মের দলবদলে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে একটাই প্রত্যাশা ছিল, ডিপ-লাইয়িং মিডফিল্ড বা রক্ষণের সামনে থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার মতো একজন খেলোয়াড়কে আনা। রিয়াল তা আনেনি।রদ্রিকে না পাওয়ার পর ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ এবং ক্লাব কর্তৃপক্ষ অন্য কোনো বিকল্পের খোঁজে না গিয়ে নিজেদের স্কোয়াডের ওপরই আস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।এখন পর্যন্ত মরিনিও বেলিংহামের পেছনে তাঁর মিডফিল্ড পিভটে খেলোয়াড় অদলবদল করেই চালিয়ে নিচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবে সবচেয়ে রক্ষণাত্মক খেলায় অভ্যস্ত অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি এখনো নিজের শতভাগ ফিটনেস ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে।মাদ্রিদ ডার্বিতে ভালভের্দে চোট পাওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হলো রিয়াল মাদ্রিদের।মৌসুমের শুরুতে গুঞ্জন ছিল, গুলেরকে হয়তো মরিনিও এই ভূমিকায় মানিয়ে নেবেন, কিন্তু সেই আশা বাস্তবে মেলেনি। চুয়ামেনি, ফেদেরিকো ভালভের্দে, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, বের্নার্দো সিলভা ও থিয়াগো পিতার্চের মধ্য থেকে ঠিক কোন দুজনকে খেলানো হলে দলীয় ভারসাম্য সবচেয়ে নিখুঁত হবে, সেই সমীকরণ মরিনিওর কাছে এখনো অস্পষ্ট। উপরন্তু মাদ্রিদ ডার্বিতে ভালভের্দে চোট পাওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হলো।শেষ চার ম্যাচের তিনটিতেই প্রতিপক্ষের চেয়ে কম বল দখল ছিল মাদ্রিদের। নিয়ন্ত্রণ হারানোটা এই মৌসুমে মাদ্রিদের বড় মাথাব্যথা। আরও স্পষ্ট করে বললে, সর্বশেষ পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই তারা দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের চেয়ে কম গোল করেছে হেরেছে।মরিনিও কি এই নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে পারবেন? নাকি সেই পথ আরও দুর্গম হতে চলেছে? সময়ই তা বলে দেবে।