এআই নিয়ে কথা উঠলে প্রায় সবাই জানতে চান, এটি আর কী কী পারবে। আমি আজকাল একটু উল্টো প্রশ্ন করি—এটি চালাতে কত বিদ্যুৎ লাগে? বড় এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ও ব্যাপক ব্যবহারের জন্য এখন বিশাল ডেটা সেন্টার লাগে। যেখানে হাজার হাজার চিপ চলে এবং সেগুলো ঠান্ডা রাখতে খরচ হয় আরও বিদ্যুৎ। এআইয়ের চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ডেটা সেন্টার চালাতে পারমাণবিক বিদ্যুতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করছে। পারমাণবিক প্রকৌশলের একজন গবেষক হিসেবে খবরটা আমার কাছে একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং একটু অস্বস্তিকরও।বিজ্ঞানচিন্তার ১০ বছর পূর্তিতে এই অস্বস্তির কথাটাই পাঠকদের বলতে চাই। বিজ্ঞানচিন্তাকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে দেখেছি, আবিষ্কারের চমকের চেয়ে পেছনের প্রশ্নগুলোই তাদের বেশি টানে। এআই নিয়ে সেই আলাপে চাকরি, নিরাপত্তা, এমনকি লেখার মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন এসেছিল। এমন প্রশ্ন তোলার জায়গা আমাদের দেশে খুব বেশি নেই। পত্রিকাটির সম্পাদক, কর্মী, লেখক ও পাঠকদের আন্তরিক অভিনন্দন।কথাটা একটু কড়া শোনাতে পারে। যে এআই খুব দ্রুত ও খুব নির্ভুল উত্তর দেয়, অথচ বাস্তবের কোনো যন্ত্রে কাজে লাগানো যায় না, সেটি আমার কাছে খুব দামি একটা ক্যালকুলেটর হয়েই থেকে যায়। ক্যালকুলেটরও দ্রুত এবং নির্ভুলও। আমরা এআইয়ের সাফল্য মাপি কোন মডেল কোন পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, তা দিয়ে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণকক্ষে কিংবা কারখানার মেঝেতে প্রশ্নটা অন্য রকম। এআইটি যন্ত্রের পাশে বসে চলবে তো? কত বিদ্যুৎ টানবে? নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কী হবে?জ্বালানি খাতে হিসাবটা আরও সোজা। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য যে এআই বানাচ্ছি, সেটি চালাতেই যদি সাশ্রয়ের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়, তাহলে লাভটা থাকল কোথায়? বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটা আরও কঠিন। এ দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গায়ে লাগে। তাই বিদ্যুৎ আর খরচের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেই প্রযুক্তি বানাতে হবে। আমাদের দরকার এমন এআই, যা ছোট একটি চিপে, অল্প বিদ্যুতে এবং কম খরচে চলবে।এখানে সবচেয়ে ভালো শিক্ষক বোধ হয় আমাদের নিজেদের মস্তিষ্ক। মানুষের মস্তিষ্ক চলে মোটামুটি ২০ ওয়াটে, যা পুরোনো দিনের একটি সাধারণ বাল্বের চেয়েও কম শক্তিতে। এই শক্তিতেই আমরা দেখি, শুনি, নতুন কিছু শিখি এবং বিপদের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিই। মস্তিষ্কের নিউরনের সংকেতভিত্তিক কাজ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি হচ্ছে নিউরোমরফিক চিপ ও স্পাইকিং নিউরাল নেটওয়ার্ক। এসব ব্যবস্থায় সব সময় সব হিসাব চালানোর বদলে সংকেতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় হিসাব করার চেষ্টা হয়। এতে বিদ্যুৎ বাঁচানোর দারুণ সুযোগ আছে।পথটা খুব একটা সহজ নয়। অ্যালগরিদম ও চিপের নকশা একসঙ্গে নতুন করে ভাবতে হয়। তবু আমার বিশ্বাস, বাস্তবে এআই কাজে লাগানোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথাই ধরা যাক। একটি কেন্দ্র কয়েক দশক ধরে চলে, তাতে থাকে হাজার হাজার যন্ত্র ও সেন্সর। কঠিন পরিবেশে সময়ের সঙ্গে সেন্সর নিজেও ক্ষয়ে যায়। ফলে তার দেওয়া তথ্যে ধীরে ধীরে ভুল ঢুকে পড়তে পারে। আবার চুল্লির ভেতরের সব জায়গার তাপমাত্রা বা চাপ সরাসরি মাপাও যায় না। কয়েকটি সেন্সরের তথ্য থেকে বাকি জায়গার অবস্থা অনুমান করতে সাহায্য করতে পারে এআই। একে বলে ভার্চ্যুয়াল সেন্সিং। এই তথ্য দিয়ে কেন্দ্রের একটি ডিজিটাল টুইন অর্থাৎ কম্পিউটারে তার ভার্চ্যুয়াল প্রতিরূপ হালনাগাদ রাখা যায়। এর ভিত্তি হলো এমন এআই মডেল, যা সময়সাপেক্ষ জটিল সিমুলেশনের কাজ অনেক দ্রুত করে দিতে পারে।এখন এই এআই যদি প্রতিটি সংকেত দূরের সার্ভারে পাঠিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় বসে থাকে, তাহলে যোগাযোগের কারণে বাড়তি দেরি হতে পারে। তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপত্তাও ভাবতে হবে। যন্ত্রের পাশেই কম বিদ্যুতের একটি চিপে চলতে পারলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করে সতর্ক করার সম্ভাবনা বাড়ে। রূপপুরের কারণে এই প্রশ্নগুলো এখন আমাদেরও প্রশ্ন।তবে এখানে এআইকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা চলে না। এআই কখন ভুল করতে পারে, তার উত্তরে কতটা অনিশ্চয়তা আছে, সেটাও বোঝার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কঠোর যাচাই আর মানুষের তত্ত্বাবধান ছাড়া এখানে কোনো প্রযুক্তি জায়গা পায় না, পাওয়া উচিতও নয়।আরেকটি বদল আমাকে বেশ আশাবাদী করে। এখন এমন এআই ব্যবস্থাও তৈরি হচ্ছে, যা শুধু প্রশ্নের উত্তর দেয় না, নির্দিষ্ট লক্ষ্য ধরে ধাপে ধাপে কাজ এগিয়ে নেয়। একে বলা হচ্ছে এজেন্টিক এআই। ধরুন, চুল্লির জন্য এমন উপাদান খুঁজছি, যা বেশি তাপ আর বিকিরণ সইতে পারে। এমন একটি ব্যবস্থায় গবেষক লক্ষ্য ঠিক করে দিলেন। এআই সম্ভাব্য উপাদান বাছাই করল, সিমুলেশন চালাল, ফল দেখে পরের ধাপ প্রস্তাব করল এবং আবার চালাল। চুল্লি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আমাদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, তুলনামূলক ছোট একটি ভাষামডেল বা ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলও সিমুলেটরে চালিয়ে যাচাই করে নিয়ন্ত্রণের কৌশল বেছে নিতে শিখতে পারে।কিন্তু এমন এজেন্টকে বারবার হিসাব করতে হবে, সিমুলেশন চালাতে হবে। প্রতিবার বিপুল বিদ্যুৎ লাগলে আবিষ্কারের খরচ আকাশ ছোঁবে। ফলে এজেন্টিক আবিষ্কারকে সাশ্রয়ীভাবে কাজে লাগাতে হলে এআইয়ের বিদ্যুৎ খরচও একসঙ্গে ভাবতে হবে। আর কোন ফলটা বিশ্বাসযোগ্য, সে সিদ্ধান্ত এখনো বিজ্ঞানীরই।তাই আগামীর এআইকে আমি শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে মাপতে চাই না। দেখতে চাই, সেটি বাস্তবের যন্ত্রে বসানো যায় কি না, অল্প বিদ্যুতে চলে কি না এবং নতুন জ্ঞান খুঁজে পেতে সাহায্য করে কি না। জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি কিংবা ভবিষ্যতের স্মার্ট গ্রিড—সব জায়গায় এমন এআইয়ের গুরুত্ব বাড়বে।বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এখানে একটি বড় সুযোগ দেখছি। সবচেয়ে বড় এআই মডেল বানানোর দৌড়ে বিপুল টাকা ও অবকাঠামো লাগে। কিন্তু সীমিত যন্ত্রে, অল্প বিদ্যুতে কীভাবে ভালো এআই চালানো যায়; এ প্রশ্নেও অনেক কাজ বাকি। এর সব কাজের জন্য বিশাল ডেটা সেন্টার লাগে না; লাগে ভালো চিন্তা, উপযুক্ত যন্ত্র আর পরীক্ষা করার সুযোগ। পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, ইলেকট্রনিকস আর কম্পিউটার একসঙ্গে বুঝতে পারলে এখানে আমাদের ছেলেমেয়েরাও পথ দেখাতে পারে।বিজ্ঞানচিন্তার কাছে আমার চাওয়া, এআইয়ের চমকের খবরের পাশে তার দামটাও পাঠকের সামনে আসুক। কত বিদ্যুৎ লাগল, কোথায় আটকে গেল, আমাদের বাস্তবতায় কাজে লাগবে কি না; এই বিষয়গুলোও আলোচনা করা হোক। কোনো কিশোর বা কিশোরী হয়তো পড়তে পড়তে ভাববে, মস্তিষ্ক যদি এত অল্প শক্তিতে এত কাজ করতে পারে, যন্ত্রকে আরও মিতব্যয়ী করা যাবে না কেন? এমন একটা প্রশ্ন থেকেই এক দিন বড় কোনো গবেষণা শুরু হতে পারে। দশ বছরের পথচলায় বিজ্ঞানচিন্তা এমন প্রশ্ন জাগিয়ে যাক। অভিনন্দন, বিজ্ঞানচিন্তা!লেখক: সহকারী অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার, প্লাজমা অ্যান্ড রেডিওলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও ন্যাশনাল সেন্টার ফর সুপারকম্পিউটিং অ্যাপ্লিকেশনস, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা-শ্যাম্পেইন, যুক্তরাষ্ট্র