• বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫২ পূর্বাহ্ন
Headline
অভিনন্দন, বিজ্ঞানচিন্তা! হোপের সেঞ্চুরির পর পলের ফাইফার, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হার ভারতের সদস্যদেশগুলোকে ৩০৫ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব ফিফার, পাবে বাংলাদেশও রোডস: সমুদ্র, ইতিহাস আর কিছু জীবন্ত স্মৃতি আয়াসের জামিন শুনানিতে বিচারকের সামনেই আইনজীবীদের হাতাহাতি সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না কেন, কী বলছেন ব্যবসায়ীরা অ্যান কারসনের নোবেল বিজয়: ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সমকালীন রূপকার বাংলাদেশে ৩৫ বছরের পরে আইনজীবী হতে বাধা কেন? নেছারাবাদে অনুমোদন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর উপায়ে আইসক্রিম উৎপাদন জরিমানা ২০ হাজার টাকা ও কারখানা বন্ধের নির্দেশ । আবাসনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছি আমরা

রোডস: সমুদ্র, ইতিহাস আর কিছু জীবন্ত স্মৃতি

Reporter Name / ০ Time View
Update : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

ভ্রমণেরও একটা নিজস্ব জীবন আছে। শুরুতে থাকে অজানাকে জানার কৌতূহল, মাঝপথে থাকে দেখা ও আবিষ্কারের আনন্দ, আর শেষবেলায় এসে মনে হয়, এতগুলো দিন কী দ্রুতই না কেটে গেল! গ্রিসের রোডস দ্বীপে এবারের সফরটিও ঠিক এভাবেই শেষের দিকে এসে দাঁড়িয়েছে। আগামীকাল সুইডেনে ফিরে যাব। সঙ্গে নিয়ে যাব কিছু দৃশ্য, কিছু অভিজ্ঞতা, কিছু পরিচিত মুখ আর এমন কিছু স্মৃতি, যেগুলো হয়তো অনেক দিন মনের মধ্যে ঘুরে বেড়াবে। রোডসে আসার আগে দ্বীপটি সম্পর্কে যা জানতাম, তার বড় অংশই ছিল ইতিহাস ও পর্যটনকেন্দ্রিক। কিন্তু কোনো জায়গা সম্পর্কে পড়া আর সেখানে গিয়ে কয়েকটি দিন কাটানো এক কথা নয়। বইয়ে ইতিহাসের সাল-তারিখ পাওয়া যায়, ছবিতে দেখা যায় সমুদ্রের নীল জল, আর ভ্রমণবিষয়ক লেখায় পাওয়া যায় দর্শনীয় স্থানের পরিচয়। কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে বাতাসের স্পর্শ অনুভব করা, নিজের চোখে চারপাশ দেখা কিংবা অচেনা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা অন্য রকম। রোডসকে আমরা দেখেছি, তার সমুদ্রে সাঁতার কেটেছি, রোদে সময় কাটিয়েছি, দ্বীপের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি এবং তার ইতিহাসকে আরও কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছি। প্রতিটি অভিজ্ঞতা আলাদা, অথচ সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে আমাদের এই কয়েক দিনের ভ্রমণকাহিনি।সমুদ্রের কাছে সময়ের হিসাব আলাদারোডসের সমুদ্রের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা আর সমুদ্রে নেমে পড়ার মধ্যে যে পার্থক্য, তা সাঁতার না কাটলে পুরোপুরি বোঝা যায় না। তীরে দাঁড়িয়ে ঢেউ দেখা একধরনের আনন্দ, কিন্তু পানিতে নেমে যখন শরীরটাকে জলের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়, তখন সমুদ্রের সঙ্গে সম্পর্কটাই যেন বদলে যায়।কখনো সাঁতার কেটেছি, কখনো রোদে শুয়ে থেকেছি, কখনো শুধু চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করেছি। ছুটির দিনগুলোতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কোথাও পৌঁছানোর তাড়া থাকে না, কিছু অর্জন করারও প্রয়োজন পড়ে না। সময়কে শুধু নিজের মতো করে কাটাতে ইচ্ছা করে।আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সময়ের সঙ্গে একধরনের প্রতিযোগিতা চলে। কাজ, দায়িত্ব, পরিকল্পনা, ভবিষ্যতের চিন্তা, কত কিছুই না সামলাতে হয়! অথচ সমুদ্রের সামনে বসে থাকলে মনে হয়, জীবনের সব সময়কে কাজে লাগাতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কিছু সময় শুধু বেঁচে থাকার আনন্দ অনুভব করার জন্যও রাখা দরকার।সমুদ্র অবশ্য কাউকে কোনো উপদেশ দেয় না। তার ঢেউ আসে, তীরে আছড়ে পড়ে, আবার ফিরে যায়। মানুষই তার মধ্যে নিজের ভাবনার প্রতিধ্বনি খুঁজে নেয়।দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.comইতিহাসের পথে হাঁটারোডসের আরেকটি আকর্ষণ তার দীর্ঘ ইতিহাস। ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে দ্বীপটি বহু শতাব্দী ধরে বাণিজ্য, সমুদ্রযাত্রা, সামরিক শক্তি ও বিভিন্ন সভ্যতার সংযোগস্থল হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন গ্রিক ঐতিহ্য থেকে শুরু করে মধ্যযুগে নাইটদের শাসন, অটোমান আমল এবং পরবর্তী ইতালীয় শাসন, সব মিলিয়ে রোডসের অতীত বেশ জটিল ও বৈচিত্র্যময়।বিশেষ করে পুরোনো রোডস শহরের পাথুরে রাস্তা, প্রাচীর, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং মধ্যযুগীয় পরিবেশের মধ্যে হাঁটলে ইতিহাসকে শুধু অতীতের ঘটনা বলে মনে হয় না। মনে হয়, সময়ের বিভিন্ন স্তর যেন একই জায়গায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।একটি শহর কত মানুষের পদচিহ্ন ধারণ করে, কত শাসকের উত্থান-পতন দেখে, কত যুদ্ধ ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় ধরে রাখে! আজ আমরা সেখানে পর্যটক হিসেবে ঘুরে বেড়াই, ছবি তুলি, স্থাপনা দেখি। অথচ এসব জায়গার প্রতিটি পাথরের পেছনে রয়েছে এমন সব মানুষের জীবন, যাদের অধিকাংশের নাম ইতিহাসে কোথাও লেখা নেই।এই উপলব্ধি ইতিহাস দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। ইতিহাস তখন শুধু রাজা, শাসক কিংবা যুদ্ধের বিবরণ থাকে না; তা হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রম, আশা, ভয় এবং টিকে থাকার গল্পও।গ্রামের পথে, ইতিহাসের ছায়ায়রোডসকে শুধু সমুদ্রসৈকত আর পুরোনো শহর দিয়ে চিনলে দ্বীপটির পুরো সৌন্দর্য বোঝা যায় না। এর আসল বৈচিত্র্য ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন গ্রাম, পাহাড়ি পথ, নিরিবিলি উপসাগর আর প্রাচীন জনপদের মধ্যে। কোথাও সাদা বাড়ির সারি পাহাড়ের গায়ে উঠে গেছে, কোথাও পাথরের দেয়ালঘেরা প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোথাও সবুজ গাছপালার মধ্যে ইতিহাস ও প্রকৃতি পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে।রোডসের এমনই একটি অনন্য জনপদ লিন্ডোস। দ্বীপের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এই গ্রাম দূর থেকেই চোখে পড়ে। পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সাদা বাড়িগুলোর ওপরে রয়েছে প্রাচীন অ্যাক্রোপলিস, যার অবস্থান যেন পুরো গ্রামটিকে আগলে রেখেছে। সরু আঁকাবাঁকা গলি, সাদা দেয়াল, ছোট ছোট উঠান, ঐতিহ্যবাহী বাড়ি আর দোকানপাটের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এখানে আধুনিক পর্যটন আর পুরোনো গ্রিক জীবনের কিছু পরিচিত চিহ্ন পাশাপাশি রয়ে গেছে।লিন্ডোসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ তার পাহাড়চূড়ার প্রাচীন দুর্গনগরী। সেখানে রয়েছে দেবী অ্যাথেনা লিন্ডিয়ার মন্দিরের অবশেষসহ বিভিন্ন যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ওপর থেকে নিচের সাদা গ্রাম, আশপাশের উপকূল আর নীল এজিয়ান সাগরের দিকে তাকালে বোঝা যায়, প্রাচীনকালে এমন উঁচু জায়গা কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখান থেকে সমুদ্র শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; যোগাযোগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তারও অংশ। নিচে রয়েছে সেন্ট পলস বে, যার বাঁকানো উপকূল ও নীল জল লিন্ডোসের সৌন্দর্যকে আরও পূর্ণতা দিয়েছে। ইতিহাস আর প্রকৃতির এমন মিলন খুব সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়।লিন্ডোসের বিশেষত্ব শুধু তার প্রাচীন স্থাপনায় নয়, তার গ্রামীণ পরিবেশেও। সরু গলিতে হাঁটলে কখনো মনে হয় সময় ধীর হয়ে এসেছে, আবার পর্যটকদের আনাগোনা মনে করিয়ে দেয়, এই পুরোনো জনপদ আজকের পৃথিবীর সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। এখানে ইতিহাসকে কাচের বাক্সে বন্দী করে রাখা হয়নি; বরং মানুষ প্রতিদিন যে পথ দিয়ে চলাচল করে, সেই পথের পাশেই ইতিহাসের চিহ্ন রয়ে গেছে।রোডসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান ফিলেরিমোস পাহাড়। ইআলিসোসের কাছে অবস্থিত এই পাহাড়ে রয়েছে প্রাচীন জনপদের নিদর্শন, ধর্মীয় স্থাপনা, গাছঘেরা পথ এবং চারপাশের বিস্তৃত ভূদৃশ্য। এখানকার মঠ ও গির্জা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ের স্মৃতি বহন করে। পাহাড়ের ওপরের পথ ধরে এগোলে ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ধর্মীয় পথের দেখা মেলে, যার শেষে রয়েছে বিশাল ক্রুশ এবং চারপাশের দৃশ্য দেখার উন্মুক্ত স্থান। ফিলেরিমোসে ইতিহাসের পাশাপাশি একধরনের নীরবতাও অনুভব করা যায়। শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সমুদ্র ও ভূমির বিস্তার দেখলে মনে হয়, প্রকৃতির কাছে এসে মানুষ কখনো কখনো নিজের ভাবনাগুলোকেও নতুন করে সাজিয়ে নিতে পারে।প্রাচীন ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থাকলে কামিরোসও রোডসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। লিন্ডোস ও ইআলিসোসের সঙ্গে কামিরোস ছিল দ্বীপটির তিনটি প্রধান প্রাচীন নগরীর একটি। পাহাড়ের ঢালে সমুদ্রের দিকে মুখ করে গড়ে ওঠা এই জনপদ একসময় কৃষি ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আজ সেখানে বাড়িঘর, জনসমাগমের স্থান, মন্দির, রাস্তা ও পানি সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখা যায়। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভাবলে বোঝা যায়, একটি শহর শুধু তার রাজনীতি বা স্থাপত্য দিয়ে তৈরি হয় না; তার পেছনে থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাবার উৎপাদন, পানি সংগ্রহ, চলাচল এবং একসঙ্গে বসবাসের দীর্ঘ ইতিহাস।প্রকৃতির অন্য রূপ দেখতে রয়েছে পেতালুদেস বা প্রজাপতি উপত্যকা। দ্বীপের পশ্চিমাংশের এই সবুজ উপত্যকা গাছপালা, জলধারা ও ছায়াঘেরা হাঁটার পথের জন্য পরিচিত। নির্দিষ্ট মৌসুমে এখানে বিশেষ একধরনের প্রজাপতি ও মথের সমাগম ঘটে। তবে এদের উপস্থিতি বছরের সব সময় সমান থাকে না; তাই শুধু নাম শুনে নয়, প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দ বুঝেই জায়গাটিকে দেখতে হয়। উপত্যকার পরিবেশে হাঁটলে সমুদ্রতীরের উন্মুক্ত রোদ আর ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্রের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এক জগৎ পাওয়া যায়। এখানে শব্দ কমিয়ে প্রকৃতিকে বিরক্ত না করে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করাটাই সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা।এই জায়গাগুলোর মধ্যে মিল যেমন রয়েছে, পার্থক্যও তেমন স্পষ্ট। লিন্ডোসে সমুদ্র, সাদা বাড়ি ও প্রাচীন স্থাপত্যের সম্মিলন; ফিলেরিমোসে পাহাড়, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিস্তৃত দৃশ্য; কামিরোসে প্রাচীন নগরজীবনের চিহ্ন; আর প্রজাপতি উপত্যকায় সবুজ প্রকৃতির নিজস্ব জগৎ। সব মিলিয়ে রোডস যেন একই দ্বীপের মধ্যে কয়েকটি আলাদা পৃথিবী সাজিয়ে রেখেছে।ভ্রমণে এসে আমরা অনেক সময় বিখ্যাত জায়গার নাম মনে রাখি, ছবি তুলে রাখি। কিন্তু কোনো জায়গার প্রকৃত পরিচয় ধরা পড়ে তখনই, যখন তার ইতিহাস, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে একসঙ্গে দেখার চেষ্টা করি। রোডসের গ্রামগুলো সেই সুযোগ দেয়। এখানে একটি সরু গলি শুধু গলি নয়, একটি পাহাড়চূড়া শুধু দৃশ্য দেখার জায়গা নয়, আর কয়েকটি ভাঙা পাথরও কেবল ধ্বংসাবশেষ নয়। সবকিছুর পেছনে রয়েছে সময়ের দীর্ঘ প্রবাহ, মানুষের জীবন এবং পৃথিবীকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা।হয়তো এ কারণেই রোডস ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় শুধু নীল সমুদ্রের ছবিই মনে থাকে না। মনে থেকে যায় সাদা গ্রামের পথ, পাহাড়ের ওপরের বাতাস, প্রাচীন নগরীর নীরবতা এবং সবুজ উপত্যকার শান্ত পরিবেশও। দ্বীপটির সৌন্দর্য তখন একটি দৃশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে নানা অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি।অচেনা মানুষের সঙ্গে পরিচয়ভ্রমণের আরেকটি আনন্দ হলো, নিজের পরিচিত জগতের বাইরে গিয়ে অন্য মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখা। রোডসে স্থানীয় মানুষ এবং অন্য ভ্রমণকারীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনে পার্থক্য থাকলেও মানুষের দৈনন্দিন আনন্দ, আতিথেয়তা, কৌতূহল কিংবা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের ইচ্ছার মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।কোনো জায়গাকে সত্যিকার অর্থে চিনতে হলে তার স্থাপনা দেখাই যথেষ্ট নয়। সেখানে যাঁরা বাস করেন, তাঁদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও কৌতূহলী হতে হয়। তাঁরা কীভাবে দিন কাটান, তাঁদের কাছে দ্বীপটির অর্থ কী, পর্যটনের ভিড়ের বাইরে তাঁদের নিজস্ব পৃথিবীটি কেমন, এসব প্রশ্ন ভ্রমণকে আরও অর্থবহ করে।আমরা কয়েক দিনের অতিথি। স্থানীয় মানুষের কাছে রোডস প্রতিদিনের জীবন, কাজ ও দায়িত্বের জায়গা। আমাদের কাছে যে দৃশ্য নতুন, তাঁদের কাছে সেটিই হয়তো প্রতিদিনের পরিচিত বাস্তবতা। একই জায়গাকে মানুষ যে কত ভিন্নভাবে দেখতে পারে, ভ্রমণ সেই শিক্ষাও দেয়।আর পরিচয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো, সব সময় দীর্ঘ আলাপের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি হাসি, আন্তরিক ব্যবহার কিংবা সামান্য কথোপকথনও অচেনা জায়গাটিকে পরিচিত করে তুলতে পারে।বন্ধুত্বের উপহারভ্রমণের আনন্দ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়, কখনো কখনো অচেনা মানুষের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি হওয়া, যা ভ্রমণ শেষ হওয়ার পরও থেকে যায়। রোডসে আমাদের থাকার জায়গা Bayside Hotel Katsaras-এর মালিক নিকের সঙ্গে তেমনই একটি সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। মজার ব্যাপার হলো, তাঁর ছোট ভাই স্টিভের সঙ্গেও আমাদের পরিচয় ও যোগাযোগ হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে দুই ভাই যেভাবে আন্তরিকতা ও যত্ন নিয়ে আমাদের সেবা করেছেন, তাতে তাঁদের কাছে আমরা সত্যিই কৃতজ্ঞ। এই ভালোবাসার ঋণ কীভাবে শোধ করব, তা অবশ্য এখনো জানি না! তবে একটা উপায় ভেবে রেখেছি। দুজনকেই সুইডেনে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। দেখা যাক, রোডসে তৈরি হওয়া এই বন্ধুত্ব এবার সুইডেন পর্যন্ত গড়ায় কি না! ভ্রমণের শেষে এটাই তো সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তিগুলোর একটি, অচেনা জায়গায় গিয়ে এমন কিছু মানুষকে পাওয়া, যাঁরা ফিরে আসার পরও হৃদয়ে থেকে যান।ভ্রমণ মানে শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়আমি মনে করি, ভ্রমণের আনন্দ শুধু কতগুলো জায়গা দেখা হলো, কতগুলো ছবি তোলা হলো কিংবা কতগুলো ঐতিহাসিক তথ্য জানা হলো, তার ওপর নির্ভর করে না। ভ্রমণ আমাদের পরিচিত জীবনের বাইরে নিয়ে যায়। দৈনন্দিন অভ্যাস থেকে সাময়িক বিরতি দেয় এবং চারপাশকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।এবারের রোডস সফরেও সমুদ্র, সাঁতার, রোদ, দ্বীপের বিভিন্ন স্থান, ইতিহাস ও মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে মিশে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মারিয়ার সঙ্গে এই সময়টুকু ভাগ করে নেওয়া। একসঙ্গে পথচলা, নতুন জায়গা দেখা, কোথাও থেমে যাওয়া কিংবা দিনের শেষে বিশ্রাম নেওয়া, দীর্ঘ দাম্পত্যের জীবনে এমন অভিজ্ঞতাগুলোও নিজস্ব মূল্য বহন করে।জীবনে বড় বড় ঘটনার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ফিরে তাকালে দেখা যায়, ছোট ছোট মুহূর্তও স্মৃতির ভেতর স্থায়ী জায়গা করে নেয়। কোনো একটি বিকেলের আলো, সমুদ্রের পানিতে কাটানো সময়, পথে দেখা কোনো দৃশ্য কিংবা অচেনা কারও সঙ্গে পরিচয়, বহুদিন পরেও মনে পড়ে যেতে পারে।সম্ভবত ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দিক এখানেই। আমরা শুধু জায়গা থেকে জায়গায় যাই না, নিজের জীবনেও কিছু নতুন অভিজ্ঞতা যোগ করি।আবার সুইডেনে ফেরাআগামীকাল আমাদের রোডস ছেড়ে সুইডেনে ফিরে যাওয়ার পালা। একটি ভ্রমণ শেষ হচ্ছে, আবার শুরু হবে পরিচিত জীবনের নিয়মিত ছন্দ। সুইডেনের পরিচিত পরিবেশ, ঘরবাড়ি, দৈনন্দিন দায়িত্ব ও অভ্যাস আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।তবে ভ্রমণ শেষ হলেই তার অভিজ্ঞতা শেষ হয়ে যায় না। আমরা ফিরে যাই, কিন্তু দেখা জায়গাগুলো মনের মধ্যে থেকে যায়। কোনো দৃশ্য নতুন করে মনে পড়ে, কোনো ঘটনা নিয়ে আবার ভাবি, কখনো পরিচিত জীবনের মধ্যেও ভ্রমণের সময় পাওয়া কোনো উপলব্ধি কাজে লাগে।রোডস আমাদের কাছে শুধু একটি গ্রিক দ্বীপ হয়ে থাকবে না। এটি হয়ে থাকবে সমুদ্রের নীল জল, রোদে কাটানো অবসর, ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা, দ্বীপের সুন্দর গ্রামগুলো এবং অচেনা মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের স্মৃতি নিয়ে।পৃথিবীতে দেখার মতো জায়গার অভাব নেই। এক জীবনে সব জায়গা দেখা সম্ভবও নয়। কিন্তু সব জায়গা দেখাই তো শেষ কথা নয়। যে জায়গায় যাই, সেখান থেকে কিছু অনুভব করতে পারলাম কি না, নতুন কিছু জানতে পারলাম কি না, নিজের পরিচিত পৃথিবীটাকে একটু অন্যভাবে দেখতে শিখলাম কি না, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।আগামীকাল রোডস থেকে বিদায় নেব। সমুদ্র থাকবে, দ্বীপ থাকবে, তার ইতিহাস ও মানুষের জীবনও চলতে থাকবে। আমরা ফিরে যাব নিজেদের জীবনে, সঙ্গে নিয়ে যাব কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা।আর এভাবেই ভ্রমণ শেষ হয়েও শেষ হয় না। জায়গা ছেড়ে চলে যাই আমরা, কিন্তু জায়গাটি থেকে যায় আমাদের স্মৃতিতে, কখনো কোনো ছবিতে, কখনো কোনো গল্পে, কখনো নিঃশব্দে ফিরে আসা এক টুকরো নীল সমুদ্রের মধ্যে।রোডস, বিদায়। কয়েক দিনের অতিথি হয়ে এসেছিলাম, ফিরছি কিছু স্মৃতি, কিছু নতুন বন্ধুত্ব আর নতুন করে অনুভব করা জীবনের আনন্দ নিয়ে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা