দুপুরে ভাত খেয়ে উঠেছেন। পেট একেবারে ভর্তি। ঠিক তখনই কেউ সামনে এক প্যাকেট গরম গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা এক টুকরো পিজ্জা এনে রাখল। পেট বলছে, আর খাব না। কিন্তু চোখ ও নাক যেন অন্য কথা বলছে। খাবেন নাকি খাবেন না, তা ভাবতে ভাবতে হয়তো কিছুটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই মুখে দিলেন। তারপর কখন যে পুরোটা শেষ করে ফেলেছেন, নিজেই টের পাননি। অথচ আপনি জানেন, এ ধরনের খাবার নিয়মিত খাওয়া শরীরের জন্য ভালো নয়। অতিরিক্ত চিনি, লবণ, চর্বি ও ক্যালোরি থাকে এসব খাবারে। ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবারের পরিমাণও অনেক সময় তুলনামূলক কম থাকে। তারপরও বার্গার, চিপস, ফ্রাই, কেক, পেস্ট্রি কিংবা আইসক্রিম দেখলে আমাদের ভরা পেটেও খেতে ইচ্ছে করে কেন? শুধু যে খাবারটা সুস্বাদু বলেই খেতে ইচ্ছে করে, তা কিন্তু নয়। এর পেছনে কাজ করে আমাদের স্বাদগ্রহণ, মস্তিষ্কের পুরস্কারব্যবস্থা, খাবারের গঠন ও উপাদানের মিশ্রণ।আমরা খাবার তেলে ভেজে খাই কেনএকই সঙ্গে শরীরে তৈরি হওয়া কিছু ওপিওয়েডও খাবার থেকে পাওয়া আনন্দের অনুভূতিতে ভূমিকা রাখে। ফলে খাবারটি শুধু পেট ভরানোর জিনিস থাকে না, আনন্দ পাওয়ারও একটি উৎস হয়ে ওঠে।জাঙ্ক ফুড এত সুস্বাদু লাগে কেনপ্রথমেই আসা যাক স্বাদের কথায়। জাঙ্ক ফুডের অনেকগুলোতেই চিনি, চর্বি ও লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। এসব উপাদান আমাদের স্বাদগ্রহণের পাশাপাশি মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সার্কিটকেও সক্রিয় করতে পারে। আমরা যখন খুব সুস্বাদু কিছু খাই, তখন মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সার্কিট ডোপামিনের মতো রাসায়নিক বার্তাবাহকের কার্যক্রম বাড়ে। একই সঙ্গে শরীরে তৈরি হওয়া কিছু ওপিওয়েডও খাবার থেকে পাওয়া আনন্দের অনুভূতিতে ভূমিকা রাখে। ফলে খাবারটি শুধু পেট ভরানোর জিনিস থাকে না, আনন্দ পাওয়ারও একটি উৎস হয়ে ওঠে। এই কারণেই কেক, পেস্ট্রি, বার্গার বা ফ্রাইয়ের মতো খাবারকে অনেক সময় কমফোর্ট ফুড বলা হয়। বিশেষ করে মন খারাপ বা চাপের সময়ে এগুলো খেতে আরও বেশি ভালো লাগে।তবে এখানে আরেকটি মজার ব্যাপার আছে। জাঙ্ক ফুড শুধু স্বাভাবিকভাবেই সুস্বাদু নয়; অনেক খাবার এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে তার স্বাদ আমাদের কাছে যতটা সম্ভব আকর্ষণীয় লাগে।প্লাস্টিকে খাবার মোড়ালে কি খাবারের ক্ষতি হয়১৯৭০-এর দশকে মার্কিন সাইকোফিজিসিস্ট হাওয়ার্ড মোসকোভিটজ ব্লিস পয়েন্ট ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।খাবারকে আরও একটু সুস্বাদু বানানোর কৌশলধরুন, আপনি এক গ্লাস শরবত বানাচ্ছেন। তাতে চিনি বাড়াতে থাকলে একটা পর্যায় পর্যন্ত শরবত আরও সুস্বাদু লাগবে। কিন্তু চিনি যদি অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন তা আর ভালো লাগবে না। খাদ্য তৈরির ক্ষেত্রেও এমন একটি উপযুক্ত মাত্রা আছে। খাবারে কতটা চিনি, লবণ, চর্বি বা অন্য উপাদান দিলে মানুষের কাছে স্বাদ সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হবে, খাদ্যশিল্পে সেটি বের করার চেষ্টা করা হয়। এই ধারণাকে বলা হয় ব্লিস পয়েন্ট।১৯৭০-এর দশকে মার্কিন সাইকোফিজিসিস্ট হাওয়ার্ড মোসকোভিটজ এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। কোনো খাবার বা পানীয়ে একটি উপাদান বাড়াতে থাকলে ভোক্তার পছন্দও বাড়তে থাকে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আবার কমে যায়। খাদ্য প্রস্তুতকারকের লক্ষ্য তাই এমন একটি মাত্রা খুঁজে বের করা, যেখানে খাবারটি মানুষের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগে। তবে শুধু একটি উপাদানের মাত্রাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল ব্যাপার লুকিয়ে থাকতে পারে একাধিক উপাদানের মিলিত প্রভাবে।বিশ্বের সবচেয়ে পুষ্টিকর কয়েকটি খাবারখাবারে কতটা চিনি, লবণ, চর্বি বা অন্য উপাদান দিলে মানুষের কাছে স্বাদ সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হবে, খাদ্যশিল্পে সেটি বের করার চেষ্টা করা হয়। এই ধারণাকেই বলা হয় ব্লিস পয়েন্ট।২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টেরা ফাজিনো ও তাঁর সহকর্মীরা অতি-সুস্বাদু খাবার নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁদের গবেষণায় এমন কিছু খাবারের বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়, যেখানে চর্বি, চিনি, সোডিয়াম ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের নির্দিষ্ট মিশ্রণ খাবারকে মজাদার করে তুলতে পারে। যেমন, চর্বি ও লবণের সমন্বয় দেখা যায় চিপসে। আবার চর্বি ও চিনির মিশ্রণ থাকে আইসক্রিম কিংবা কেকের মতো খাবারে। ক্র্যাকার বা পপকর্নের মতো খাবারে কার্বোহাইড্রেট ও লবণের সমন্বয় দেখা যায়।গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সরবরাহের একটি বড় ডেটাবেস বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন, সেখানকার প্রায় ৬২ শতাংশ খাবারে এমন অন্তত একটি অতি-সুস্বাদু উপাদানের মিশ্রণ ছিল। এমনকি যেসব পণ্যে চিনি, চর্বি বা লবণ কম বলে দাবি করা হয়, সেগুলোরও প্রায় অর্ধেককে এই শ্রেণিতে ফেলা হয়েছিল। অর্থাৎ কোনো খাবার শুধু মিষ্টি বা শুধু নোনতা বলেই যে আমাদের অনেক ভালো লাগবে, তা নয়। বিভিন্ন স্বাদ ও উপাদান একসঙ্গে মিলে খাবারকে আরও মজাদার বানাতে পারে।বয়স বাড়লে খাবার আগের মতো মজা লাগে না কেনগবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সরবরাহের একটি বড় ডেটাবেস বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন, সেখানকার প্রায় ৬২ শতাংশ খাবারে এমন অন্তত একটি অতি-সুস্বাদু উপাদানের মিশ্রণ ছিল।এক স্বাদে বিরক্ত, আরেক স্বাদে ক্ষুধাএবার ধরুন, আপনি এক প্যাকেট নোনতা চিপস খাচ্ছেন। প্রথম কয়েকটি চিপস যতটা সুস্বাদু লাগছিল, একসময় হয়তো ততটা লাগছে না। কারণ একই স্বাদ বারবার পেলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সেই আনন্দের অনুভূতিতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে বলেন সেন্সরি-স্পেসিফিক স্যাটাইটি। ১৯৮১ সালে ব্রিটিশ পুষ্টিবিজ্ঞানী বারবারা রোলস ও মনোবিজ্ঞানী এডমন্ড রোলস এই প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। সহজ ভাষায়, একই ধরনের স্বাদ খেতে খেতে আমাদের আগ্রহ কমে যায়। কিন্তু খাবারের স্বাদ বদলে গেলে আবার খাওয়ার ইচ্ছা ফিরে আসতে পারে। এ কারণেই হয়তো মিষ্টি, নোনতা, মচমচে কিংবা বিভিন্ন স্বাদের খবার বেশি পছন্দ করি। একটি স্বাদে যখন আগ্রহ কমে আসে, অন্য স্বাদটি আবার নতুন করে আকর্ষণ তৈরি করে। খাবারে বৈচিত্র্য থাকলে মানুষ সাধারণত বেশি খেতে পারে।মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাবেন কিএকই স্বাদ বারবার পেলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সেই আনন্দের অনুভূতিতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে বলেন সেন্সরি-স্পেসিফিক স্যাটাইটি।খাবার দেখেও খাওয়ার আগ্রহ বাড়ে বা কমেশুধু স্বাদ নয়, খাবার দেখেও আমাদের মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়। উজ্জ্বল রঙের, সুন্দরভাবে সাজানো বা দেখতে টাটকা খাবার আমাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। খাদ্য প্রস্তুতকারকেরা তাই খাবারের রং ও চেহারার দিকেও বিশেষ নজর দেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য তৈরি খাবারে উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় রঙের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। এর পেছনে আমাদের পুরোনো একটি প্রবণতাও কাজ করতে পারে। প্রকৃতিতে উজ্জ্বল রঙের অনেক ফল পাকা ও পুষ্টিকর হওয়ার সংকেত দেয়। তাই কোনো খাবারের উজ্জ্বল রং দেখলে সেটি আমাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ খাবার মুখে দেওয়ার আগেই তার চেহারা আমাদের মস্তিষ্কে একটি প্রত্যাশা তৈরি করে দেয়—এটা নিশ্চয়ই সুস্বাদু!টক জাতীয় খাবার দেখলে জিবে পানি আসে কেনপ্রকৃতিতে উজ্জ্বল রঙের অনেক ফল পাকা ও পুষ্টিকর হওয়ার সংকেত দেয়। তাই কোনো খাবারের উজ্জ্বল রং দেখলে সেটি আমাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।মানসিক চাপেও কেন জাঙ্ক ফুডের কথা মনে পড়েশুধু ক্ষুধার সময়ই নয়, মানসিক চাপের সময়ও অনেকের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে ইচ্ছা করে। এর পেছনে শরীরের স্ট্রেস-প্রতিক্রিয়ার ভূমিকা আছে। মানসিক চাপের সময় শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। কর্টিসল শরীরকে চাপের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে এবং ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আগ্রহেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মন খারাপ, উদ্বেগ বা চাপের সময় অনেকের বেশি ক্যালোরি, চিনি কিংবা চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। তখন এক প্যাকেট চিপস বা কয়েক টুকরো কেক যেন শুধু খাবার থাকে না, সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার উপায়ও মনে হয়। এ কারণেই কমফোর্ট ফুড কথাটা শুধু কথার কথা নয়। খাবার থেকে পাওয়া আনন্দের সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম এবং আবেগের সম্পর্ক রয়েছে।তারিখ পার হয়ে যাওয়া খাবার খাব কিমানসিক চাপের সময় শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। কর্টিসল শরীরকে চাপের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে ও খাবারের প্রতি আগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে।তাহলে কি জাঙ্ক ফুড খেলেই সর্বনাশঅবশ্যই নয়। মাঝে মাঝে পছন্দের খাবার খাওয়া ও নিয়মিত অতিরিক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এক বিষয় নয়। সমস্যাটা তৈরি হয় যখন এমন খাবার আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের বড় অংশ হয়ে যায়। ২০১৯ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের একটি গবেষণায় দেখা যায়, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া ব্যক্তিরা অপ্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া দলের তুলনায় দিনে গড়ে প্রায় ৫০০ ক্যালোরি বেশি খাবার গ্রহণ করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের ওজনও বেড়েছিল। অর্থাৎ, শুধু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন বললেই বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যায় না। কিছু খাবারের গঠন, স্বাদ, উপাদানের সমন্বয় এবং আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক পুরস্কারব্যবস্থা মিলেই বেশি খাওয়ার ইচ্ছা হয়।লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তাসূত্র: সায়েন্স এবিসিদৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় যে ৫ খাবার থাকা উচিত