রাতের আঁধারে ভাঙচুরে জড়িত নয় দাবি সমিতির ! বরাদ্দপত্র, উচ্ছেদ আদেশ ও সরকারি নথি যাচাইয়ের দাবি ? একই জমি ঘিরে পাল্টাপাল্টি দাবিতে বাড়ছে রহস্য
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জমিটির বরাদ্দ, দখল, উচ্ছেদ এবং সাম্প্রতিক স্থাপনা ভাঙচুরকে ঘিরে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে একাধিক পক্ষ। এরই মধ্যে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড দাবি করেছে, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) ২০০৬ সালে তাদের নামে ওই জমি বরাদ্দ দিলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা বাস্তবে জমিটির দখল বুঝে পাননি।গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সম্পাদক শাহ আলম। তিনি বলেন, সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার পরও নানা কারণে সমিতি জমিটিতে যেতে পারেনি। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে জমিটি অন্য পক্ষের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং একাধিকবার উচ্ছেদ-সংক্রান্ত উদ্যোগ বা আদেশের কথা থাকলেও তারা কার্যকরভাবে দখল বুঝে নিতে পারেননি।২০০৬ সালের বরাদ্দ তারপরও দখল অনিশ্চিত,সমিতির সম্পাদক শাহ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে জমিটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়ার পরও জমিটির বাস্তব দখল সমিতির হাতে আসেনি।তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময়ে সাবেক কাউন্সিলর কাশেম মোল্লার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে রাড্ডা ক্লিনিকের পক্ষ থেকে জমিটি দখলে রাখা হয়েছিল।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য, বরাদ্দপত্র, উচ্ছেদ-সংক্রান্ত আদেশ এবং অন্যান্য সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ জমিটির মালিকানা ও বৈধ দখল নিয়ে এখন একাধিক দাবি সামনে এসেছে।রাতের ঘটনার সঙ্গে আমরা জড়িত নই’
সাম্প্রতিক সময়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। সমিতির সম্পাদক শাহ আলম স্পষ্টভাবে দাবি করেন, রাতের আঁধারে স্থাপনা ভাঙার ঘটনায় সমিতির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।তার ভাষায়, রাতের বেলায় কারা বা কোনো তৃতীয় পক্ষ সেখানে ভাঙচুর করেছে, সে বিষয়ে তারা অবগত নন। সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা জায়গাটি খালি অবস্থায় দেখতে পান। এরপর সমিতির পক্ষ থেকে সেখানে সাইনবোর্ড লাগানো হয়।শাহ আলম জানান, ঘটনা জানার পর তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি আইনগতভাবে উপস্থাপনের অংশ হিসেবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা, আসামি কয়েকশ,এদিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে ইতোমধ্যে শাহ আলী থানায় মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলায় কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।ফলে একই জমিকে কেন্দ্র করে একদিকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ, অন্যদিকে ২০০৬ সালের সরকারি বরাদ্দের ভিত্তিতে জমিটির ওপর নিজেদের অধিকার দাবি করছে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি।এই দুই ধরনের দাবির কারণে পুরো ঘটনাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা।কার দখল বৈধ,উত্তর খুঁজছে নথিতে,সমিতির নেতাদের বক্তব্য, তারা দীর্ঘদিন ধরে আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে অপেক্ষা করেছেন। তাদের দাবি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বরাদ্দপত্র, দখলসংক্রান্ত নথি, উচ্ছেদ আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড পর্যালোচনা করলেই জমিটির বৈধ মালিকানা ও দখলের বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।তাদের মতে, কোনো পক্ষ যদি বেআইনিভাবে সরকারি বা বরাদ্দকৃত জমি দখল করে থাকে, তাহলে নথিপত্র যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে। কারণ জমির মালিকানা বা দখল নিয়ে বিরোধ থাকলেও কোনো স্থাপনা ভাঙচুর, লুটপাট বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটির দায় নির্ধারণ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের বিষয়।ভাঙচুরের আগে-পরে কী ঘটেছে,তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন?ঘটনার সময়, স্থাপনা ভাঙার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, কীভাবে তারা সেখানে প্রবেশ করল, কোনো অনুমোদন বা প্রশাসনিক নির্দেশ ছিল কি না, ভাঙচুরের পর কারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং সেখানে সাইনবোর্ড লাগানোর সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলোএসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।একই সঙ্গে ২০০৬ সালের বরাদ্দের পর সমিতিকে কেন দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, দখল হস্তান্তরের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী ছিল, অতীতে কোনো উচ্ছেদ অভিযান বা আদেশ হয়ে থাকলে তার বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছিল—এসব বিষয়ও নথিপত্রের আলোকে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।প্রশাসনিক নিষ্পত্তির দাবি সংশ্লিষ্টদের মতে, জমির মালিকানা বা দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলে তা কোনোভাবেই সংঘাত বা ভাঙচুরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত নয়। বরং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রয়োজন হলে আদালতের মাধ্যমে বিষয়টির আইনগত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।বিশেষ করে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের মতো একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ভাঙচুরের অভিযোগ এবং একই জমির ওপর একটি সমবায় সমিতির পুরোনো বরাদ্দের দাবি দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা জরুরি।নিরপেক্ষ তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত ঘটনা,সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির দাবি সত্য হলে ২০০৬ সালের বরাদ্দের পরও কেন তারা প্রায় দুই দশক ধরে দখল থেকে বঞ্চিত ছিল তার প্রশাসনিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। আবার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পক্ষ থেকে জমি ও স্থাপনার বৈধতার বিষয়ে কোনো নথি বা দাবি থাকলে সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মূল নথি যাচাই, পূর্ববর্তী উচ্ছেদ আদেশ ও আদালতের নথি পর্যালোচনা, জমির বর্তমান রেকর্ড পরীক্ষা এবং সাম্প্রতিক ভাঙচুরের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।তাই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের জমি নিয়ে চলমান বিরোধে কোনো পক্ষের দাবি একতরফাভাবে গ্রহণ না করে সরকারি নথিপত্রের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির দাবি এখন জোরালো হচ্ছে।জমির বরাদ্দ কার নামে, দখল কার আর রাতের ভাঙচুরের পেছনে কারা ছিল, এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই এখন পুরো ঘটনার মূল রহস্য।