
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো ফেডারেশনের দীর্ঘ ২৮ বছরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল ইসলাম রানা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম এবং মানিলন্ডারিংয়ের দালিলিক প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত এনএসসির ৫ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘স্পেশাল অডিট টিম’ ২০২০-২০২৪ অর্থবছরের নথিপত্র নিরীক্ষা করতে গিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছে।
তদন্তে সরকারি অনুদান তছরুপ, ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে মানিলন্ডারিং আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে।
এনএসসির একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, রানার সময়ে ফেডারেশনের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ন্যূনতম চর্চা ছিল না। অডিট চলাকালীন ফেডারেশন কর্তৃপক্ষ আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো রেজিস্টার বা লেজার বুক উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সভার কার্যবিবরণী (মিটিং মিনিটস), প্রতিযোগিতার ব্রোশিয়র কিংবা পূর্ববর্তী অডিট রিপোর্টের সাথে কোনটার কোন মিল খুঁজে পায়নি স্পেশাল অডিট টিম।
ফেডারেশনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আয়ের উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে—এনএসসি ও মন্ত্রণালয়ের সরকারি বরাদ্দ, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের অনুদান, ওয়ার্ল্ড তায়কোয়ানডো, কুক্কিয়ন ও কোইকা (KOICA) থেকে প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা, স্পন্সরশিপ এবং বিভিন্ন ফি (ক্লাব রেজিস্ট্রেশন, বেল্ট ও ড্যান টেস্ট)। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, এই বিপুল অর্থের সুষ্ঠু হিসাব রক্ষণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সাবেক কমিটি।
স্পেশাল অডিট টিমের অনুসন্ধানে যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে:
১. ক্রীড়া সামগ্রী ও মেডেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়নীতি বা পিপিআর (PPR)-এর তোয়াক্কা করা হয়নি।
২. আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতায় বিদেশি অংশগ্রহণকারীদের ফি ফেডারেশনের অ্যাকাউন্টে না এনে পেপ্যাল (PayPal), ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে, যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের পরিপন্থী।
৩. সোনালী ব্যাংকে ফেডারেশনের বৈধ হিসাব থাকা সত্ত্বেও, বিকেএসপিতে অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক তায়কোয়ানডো প্রতিযোগিতা’র ফি জমা নেওয়া হয় এনএসসির অনুমোদনহীন ‘বাংলাদেশ তায়কোয়ানডো অ্যাসোসিয়েশন’ নামের একটি হিসাবে। এই হিসাব পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন রানার সহযোগী নূরুদ্দিন হোসেন।
৪. দেশীয় প্রতিযোগীদের ফি সরাসরি মাহমুদুল ইসলাম রানার ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে গ্রহণ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্ত চলাকালীন অডিট টিম মাহমুদুল ইসলাম রানাকে তলব করলে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগিদের মধ্যে মো: মোসলেম মিয়া ও মো: পলাশ মিয়াসহ ফেডারেশনে সাক্ষাত করেন।
শুরুতে রানা দাবি করেন, খ্যাতনামা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দিয়ে তাদের অডিট সম্পন্ন করা হয়েছে এবং কোনো ভুল নেই। নথিপত্রের অসঙ্গতিগুলোকে তিনি ‘খেলার স্বার্থে’ করা হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে অডিট কর্মকর্তাদের দালিলিক প্রমাণ ও জেরার মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে তিনি অনিয়ম ও ভুলের বিষয়টি স্বীকার করে নেন, তবে দাবি করেন—এসব সিদ্ধান্ত তিনি একা নেননি, বরং নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সম্মতিতেই সব কিছু করা হয়েছে।
মাত্র চার বছরের (২০২০-২০২৪) আংশিক অডিটেই যেখানে লক্ষ লক্ষ টাকা অর্থ তছরুপের চিত্র উঠে এসেছে, সেখানে গত ২৮ বছরে ফেডারেশনের কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে শঙ্কিত ক্রীড়া মহল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এনএসসির এই প্রতিবেদন কেবল ‘আইসবার্গের চূড়ামাত্র’। তায়কোয়ানডোর স্বার্থেই মাহমুদুল ইসলাম রানার গত ২৮ বছরের সকল আয়-ব্যয়ের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ ‘ফরেনসিক অডিট’ প্রয়োজন।
ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিগত কমিটির প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে পৃথক তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
Leave a Reply