
সুমন খান:
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রের শিকার জেলবন্দী,
১২ই মার্চ ২০২৫ রোজ বুধবার গতকাল বিকাল ৪:৩০ সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিট আলোচনা সভা ও ইফতার সহ)
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (৩য় তলা ৮/৪-এ ৪-এ সেগুন সেগুনবাগিচা, ঢাকা।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় রচিত হয়, যখন পিলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, সাহসী বিডিআর এর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত না করেই একটি প্রহসনমূলক বিচার করা হয়, যেখানে বহু নিরীহ বিডিআর সদস্যকে মিথ্যা অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে কঠোর সাজা দেওয়া হয়।
তৎকালীন সরকার পিলখানায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এবং পিলখানার বাহিরে অবস্থানরত অন্যান্য ব্যাটালিয়ন/সেক্টর/ট্রেনিং স্কুলে কর্মরত বিডিআর সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ব্যস্তবায়ন করে। হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করার লক্ষ্যে গণহারে নিরপরাধ বিডিআর সদস্যদের বিনা বিচারে জেলখানায় বন্দি রাখা হয়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় যাদের ফৌজদারি মামলায় কোনোভাবে জেল দেওয়া যায় নাই, তাদেরকে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে জেল জরিমানাসহ চাকরিচ্যুত ও অন্যান্য সাজা প্রদান করা হয়।
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ইং সালে পিলখানায় যখন হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়, পিলখানার বাহিরে দেশের অন্যান্য ইউনিটের বিডিআর স্থাপনাগুলো ছিল পুরোপুরি শান্ত এবং ঐ দিন বিভিন্ন ইউনিটের নিরাপত্তায় নিয়োজিত জওয়ানদের অস্ত্র অস্ত্রাগারে জমা নিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু পরের দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ পিলখানার বাহিরে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে নিম্নোক্ত কিছু ঘটনা ঘটেঃ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সকাল হতে সারাদেশে বিডিআরের কয়েকটি স্থাপনায় সেনাসদস্যরা অবস্থান নেয়।
রাজশাহী সেক্টরে জোর পূর্বক অস্ত্রাগারের চাবি নেয়ার জন্য কয়েকজন সেনাসদস্যের সাথে সেক্টরের গেটে ধস্তাধস্তি হয়।
আনুমানিক সকল ০৯টা হতে ১০টার মধ্যে পিলখানার বাহিরের শুধুমাত্র দু-একটি ইউনিট বাদে বাকি সকল ইউনিট থেকে সকল সেনা কর্মকর্তাদেরকে ইউনিট ত্যাগের পরিকল্পিত নির্দেশনা প্রদান করা হয় যা ইউনিটগুলোর “চেইন অফ কমান্ড” বিলুপ্ত করে সেখানে অভিভাবক শূন্য করা হয়।
পরবর্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্থানের (যেমন খাগড়াছড়ি) বিডিআর ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়।
এবং উপরোক্ত ঘটনাটি টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়।
এছারাও অপরিচিত বিভিন্ন মোবাইল নাম্বার দিয়ে সৈনিকদের উস্কানি দেয়া হয় ও আতঙ্কিত করা হয়।
এই ঘটনাগুলো দ্বারা দেশের সকল বিডিআর ইউনিট সমূহে অবস্থানরত সৈনিকদের মনে ভিতির সঞ্চার হয় যা দুই বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। যার কারণে নিরাপত্তা হীনতার তাগিদ থেকে বিডিআর সদস্যরা তাদের পরিবার, সরকারি সম্পদ ও নিজেদের সুরক্ষার জন্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে চিহ্নিত করে হাজারো নিরীহ বিডিআর সদস্যকে গ্রেফতার, জেল-জরিমানা এবং চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর শাস্তির শিকার করা হয়। যা ছিলো বিচারের নামে চরম প্রহসন ও স্বেচ্ছাচারিতার এক নগ্ন নিদর্শন। এর মাধ্যমে হাজার হাজার নিরপরাধ বিডিআর সদস্যদেরকে চাকরিচ্যুত করে তৎকালীন সরকার কর্তৃক সৃষ্ট পরিস্থিতিকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।আমরা বিডিআর সদস্যরা শুধুমাত্র পেশাগত জীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হই নাই বরং সামাজিক, পারিবারিক এবং অর্থনৈতিক জীবনেও ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হয়েছি। আমাদের পরিবারগুলো অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আমাদের পরিবারগুলোর মানসিক শান্তি ও স্থিতি পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে। এ ঘটনার ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা এখনও স্লামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে যাচ্ছি, যা আমাদের
মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ মহলের সংশ্লিষ্টতা বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের মতামতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে নিরপরাধদের ওপর দোষ চাপিয়ে ফাঁসি ও যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থান্বেষী মহল ও ফ্যাসিস্ট সরকার এই হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার জন্য জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছে। এই কমিশনের মাধ্যমে প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকাণ্ডের বাস্তবায়নকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের সাজানো বিচারে দোষী সাব্যস্ত নিরপরাধ সদস্যদের দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নতুনভাবে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই কমিশন কতটা কার্যকর হবে, যদি পূর্বের পূর্বনির্ধারিত রায় বহাল থাকে? প্রকৃত খুনিরা অন্ধকারে থেকে যাবে, আর নিরপরাধ সৈনিকরা অন্যায় বিচারের শিকার হতে থাকবে। এই অন্যায় বিচার টিকিয়ে রাখার পেছনে রয়েছে সেই মহল, যারা প্রকৃত সত্য প্রকাশ হতে দিতে চায় না। তারা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে যেন ফ্যাসিস্ট সরকারের সাজানো বিচারের রায় বহাল থাকে এবং প্রকৃত অপরাধীরা কখনো আইনের আওতায় না আসে।
নিম্নলিখিত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন,
অন্যায়ভাবে সাজাপ্রাপ্ত ১৮,৫১৯ জন বিডিআর সদস্যের পুনর্বহালঃ পিলখানার ভেতরে ও বাইরে ১৮টি বিশেষ আদালত এবং মহাপরিচালক ও অধিনায়কের সামারি কোর্ট গঠনের মাধ্যমে মিথ্যা অভিযোগে চাকরিচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত সকল বিডিআর সদস্যদেরকে পুনর্বহাল করতে হবে এবং তাদের ক্ষতিপূরণ ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তদন্ত কমিশনঃ কমিশনের কার্যপরিধিকে কোনো গোপন শর্তের আওতায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। কমিশনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে, এজন্য প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত “ব্যতীত” শব্দ এবং কার্যপরিধি ২-এর (ঙ) নং ধারা বাতিল করতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং নির্দোষ বিডিআর সদস্যদেরকে মুক্তি দিতে হবে।
আমরা মনে করি, যদি এই তদন্ত কমিশন প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এটি জনগণের সাথে আরেকটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই হবে না। জাতি এখনো সত্যের অপেক্ষায় রয়েছে।
আমরা সাংবাদিক সমাজ এবং গণমাধ্যমকে অনুরোধ করছি, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সত্য প্রকাশে অগ্রণী ভূমিক রাখতে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদ সকল সেনা কর্মকর্তার আত্মার শান্তি এবং কারাবন্দি বিডিআর সদস্যদের ন্যায়বিচারে স্বার্থে আমরা সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছি।
Leave a Reply