• বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৩ পূর্বাহ্ন
Headline
ফেনীতে দুর্গাপূজায় ‘মদ খেয়ে নাচানাচি’ করলে ধরে আনার ঘোষণা পুলিশ সুপারের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো অধ্যাপক জামাল উদ্দিনকে ছয় কোটি বাংলাদেশি যে ছয় কারণে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে গ্রাম থেকে জাতিসংঘের মঞ্চে: ১৪ বছরের মানবিক উদ্যোগের আন্তর্জাতিক যাত্রা সামনে কি তাহলে তারাও টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে খেলবে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনায় বারবার আক্রমণ কেন? কাঠালিয়ায় কোটি টাকার ব্রিজে কাঠের সাটারিং! তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকদের বাধা ও ভিডিও চিত্র ধারণের অভিযোগ বিএম কলেজের মেধাবী ছাত্রী ঝুমুরের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার ইনষ্টিটিউশনের শিক্ষার্থীদের আনন্দ র‌্যালি ৫ শর্ত পূরণ না হলে মিয়ানমারে ফিরতে চায় না ৮৭% রোহিঙ্গা: গবেষণা

রাড্ডা ক্লিনিক গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তদন্ত দাবি এমপি তুলির, উঠেছে জামায়াত-আ.লীগের ইন্ধনের অভিযোগ

Reporter Name / ২৬ Time View
Update : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার পেছনে জামায়াতে ইসলামী কিংবা আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের পরোক্ষ ইন্ধন ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া রাড্ডা ক্লিনিক প্রাঙ্গণ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ দাবি জানান।

সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘অন্যায় তো অন্যায়ই। এটা আওয়ামী লীগ, জামায়াত কিংবা বিএনপি—যার নাম ব্যবহার করেই করা হোক না কেন, কোনো অন্যায়কারীকেই আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।’

তিনি বলেন, মিরপুরের একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন হামলার ঘটনা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা দেওয়া উচিত নয়। হামলার ঘটনায় জামায়াত বা আওয়ামী লীগের কোনো পরোক্ষ ইন্ধন কাজ করেছে কি না, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তা বের করে জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

তবে সংসদ সদস্যের এই বক্তব্যে উল্লিখিত রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত-সিদ্ধান্ত বা নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

মধ্যরাতে শতাধিক মানুষের হামলা
পুলিশ ও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার পর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, মুখোশ পরা ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে।

হামলাকারীরা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি এনে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, হামলার সময় ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা, সরকারি টিকাদান কর্মসূচির রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হয়।

ভাঙচুরের পর স্থাপনার সামনে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ লেখা একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয় বলেও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। এ ঘটনায় জমি দখলের উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।

প্রায় ৫০ বছরের স্বাস্থ্যসেবা এক রাতে ধ্বংস,রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর এলাকার নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০-এর দশক থেকে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে মাতৃস্বাস্থ্য, প্রসূতিসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল। সরকারি টিকাদান কর্মসূচিও সেখানে পরিচালিত হতো।

হামলার পর পুরো স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি কীভাবে চালু রাখা হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিকল্প স্থানে টিকাদানের উদ্যোগ
স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি বন্ধ না করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি।

তিনি বলেন, মিরপুর-১ নম্বরের রুহানী টাওয়ারে তাঁদের একটি কার্যালয় রয়েছে। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে রাড্ডা ক্লিনিকের সংশ্লিষ্টদের ওই কার্যালয়ে সাময়িকভাবে সেবা পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ ভবনটি ধ্বংস হয়ে গেলেও মা ও শিশুদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং টিকাদান কার্যক্রম যাতে থেমে না যায়, সে বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

মামলা, আসামি ও চারজন গ্রেপ্তার
ঘটনার পর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় মিরপুরের স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াকে নামীয় আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে।

মামলায় অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি এবং ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করে শাহ আলী থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—মো. সোহেল (২২), মো. জুয়েল (২৩), মো. জিহাদ হাসান (২১) ও মো. রাবিব (২০)। শনিবার তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ভাঙচুরে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে তাঁরা হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকার পরও প্রশ্ন
রাড্ডা ক্লিনিক গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত ছিল বলে শাহ আলী থানার ওসি জানিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ উপস্থিত থাকার পরও কেন তখন কাউকে আটক করা হয়নি—এ প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।

ঘটনাটি নিয়ে এই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আসছে। কারণ একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাতের বেলায় কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা, লুটপাট ও ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ধ্বংস করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে হামলাকারীদের আটক করা যায়নি—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রধান আসামি হানিফ মিয়া এখনো গ্রেপ্তার হননি
মামলায় নাম উল্লেখ করা প্রধান আসামি স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা ও জমি দখলের ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ তদন্তাধীন এবং হানিফ মিয়া ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ফলে তদন্তে তাঁর প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন কি না কিংবা হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

আলোচনায় নারী সংসদ সদস্য ফেরদৌসী মিষ্টির নাম
ঘটনার পর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নামও আলোচনায় এসেছে। তিনি ‘সমমনা দোকানদার মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সদস্য বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কোনো সমিতির সদস্য হওয়া এবং হামলা বা ভাঙচুরে সরাসরি জড়িত থাকার বিষয় এক নয়। তাঁর বিরুদ্ধে হামলায় প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ তদন্তকারী সংস্থা এখনো প্রকাশ করেনি। ফলে তাঁর ভূমিকা নিয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, সেগুলোও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।রাড্ডা ক্লিনিকের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ছিল কি না এবং হামলার মূল উদ্দেশ্য জমি দখল করা ছিল কি না—এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারণ হামলার পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং সেখানে একটি সমিতির নামসংবলিত সাইনবোর্ড টাঙিয়ে যাওয়ার ঘটনা জমি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টিকে সামনে এনেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে জমি দখলের চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে জমিটির মালিকানা, সমিতির দাবি এবং রাড্ডা কর্তৃপক্ষের অবস্থান—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আইনি অবস্থান যাচাই করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের তদন্ত চান তুলি
এ অবস্থায় সানজিদা ইসলাম তুলি বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে যে পক্ষই জড়িত থাকুক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—অপরাধের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, জামায়াত, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নাম জড়িত থাকলেও তদন্তে কারও প্রতি পক্ষপাত করা যাবে না।

রাড্ডা ক্লিনিকে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রধান আসামি হানিফ মিয়াসহ মামলার অন্য আসামিদের ভূমিকা তদন্তাধীন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ, জমি দখলের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য, হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি কেন টার্গেট করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই তদন্তের মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, যে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে নিম্নআয়ের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেটি ধ্বংসের ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং বিকল্প ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত সচল করা এখন সংশ্লিষ্টদের সামনে দুটি জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা