
স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়া এলাকায় আইনুদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেসা ওয়াকফ এস্টেটের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যে নতুন করে ভূমি দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ইমনসহ একটি চক্রের বিরুদ্ধে জমিতে বাউন্ডারি নির্মাণের চেষ্টা, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার এবং প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট জমির দাবিদাররা।
অভিযোগকারীদের দাবি, আইনুদ্দিন হায়দার ও ফয়জুন্নেসা ওয়াকফ এস্টেটের সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান এবং জমিগুলোতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে স্ট্যাটাসকো/নিষেধাজ্ঞার নির্দেশনা রয়েছে। আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ জমিতে কোনো পক্ষেরই নতুন করে নির্মাণ বা দখল কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই বলে তারা দাবি করছেন।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিএস, এসএ ও সিটি জরিপের বিভিন্ন রেকর্ডে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা নিয়ে ওয়াকফ এস্টেটের নাম রয়েছে। বিশেষ করে সিএস দাগ নম্বর ২০-এর জমি নিয়ে বিরোধ সবচেয়ে বেশি। অভিযোগকারীদের দাবি, বৈধ দলিল, সিটি জরিপের কাগজপত্র ও নিয়মিত খাজনা পরিশোধের নথি তাদের কাছে রয়েছে।
তবে এসব নথি ও আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি উপেক্ষা করে একটি চক্র জমিতে দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাংবাদিক পরিচয়ে ইমনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ইমন সম্প্রতি বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের নিয়ে বিরোধপূর্ণ জমিতে উপস্থিত হন। অভিযোগকারীদের দাবি, সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের পক্ষে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এমনকি সংশ্লিষ্ট জমিতে নিজেদের ২২ কাঠার একটি প্লট রয়েছে বলে দাবি করা হলেও এখন পর্যন্ত সেই দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈধ কাগজপত্র প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইমনসহ সংশ্লিষ্ট একটি চক্র বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে বিরোধপূর্ণ জমিতে বাউন্ডারি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এ সময় প্রকৃত মালিকানা দাবি করা ব্যক্তিরা বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ওই এলাকায় একাধিক প্লট দখলের সঙ্গে ইমনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের কয়েকজন সাংবাদিককে জমি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একটি বিরোধপূর্ণ জমির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
এডিসির নির্দেশনার পরও কাজের অভিযোগ
জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পর মিরপুরের ডিসি কার্যালয়ের উদ্যোগে উভয় পক্ষকে ডেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
তাদের দাবি, এডিসি মো. আশরাফুল ইসলাম সংশ্লিষ্টদের আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি অবহিত করে স্পষ্টভাবে জানান—কোর্টের পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ জমিতে কোনো পক্ষই কোনো ধরনের নির্মাণকাজ বা পরিবর্তন করতে পারবে না।
এরপরও ওই জমিতে বাউন্ডারি নির্মাণের চেষ্টা করা হয়ে থাকলে তা আদালতের নির্দেশনার প্রতি অবমাননার শামিল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ
অভিযোগকারীরা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, আদালতের স্ট্যাটাসকো বা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন নামে-বেনামে সংশ্লিষ্ট জমি বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এ ঘটনায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান নামে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন বরাদ্দ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
৯৯৯-এ ফোন, পুলিশ গিয়ে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ
বিরোধপূর্ণ জমিতে দখল বা নির্মাণকাজের চেষ্টা হলে স্থানীয়রা একাধিকবার জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশি সহায়তা চেয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ এবং বিরোধপূর্ণ জমিতে কোনো ধরনের কাজ না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে।
তবে এরপরও কয়েকজন কথিত সাংবাদিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং গণমাধ্যমে একপাক্ষিক তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নবী, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধেও স্ট্যাটাসকো অমান্য করে জমিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জমি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অস্বীকার করলে তাদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
প্ল্যান অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন
এদিকে দুয়ারীপাড়া এলাকার ড্যাফোডিল মান্নান নামে এক ব্যক্তির জমির প্ল্যান অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, রাজউকের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্ল্যানের বৈধতা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত না করে ওই এলাকায় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং সাংবাদিক পরিচয়দানকারী ইমনসহ কয়েকজন এতে সমর্থন বা সহযোগিতা করছেন।
তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট রাজউক নথি, প্ল্যান অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
একাধিক মামলা ও অভিযোগ চলমান
জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়ে রূপনগর থানায় একাধিক অভিযোগ এবং আদালতে মামলা চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রকৃত মালিকানা ও জমির বৈধতা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের। তাই আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কোনো পক্ষ জমিতে নির্মাণ, দখল কিংবা সীমানা পরিবর্তনের চেষ্টা করলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতিও স্থানীয়দের আহ্বান—কোনো পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে একতরফা সংবাদ প্রকাশ না করে সিএস, এসএ, সিটি জরিপ, খাজনা, দলিল, আদালতের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করা হোক।
স্থানীয়দের মতে, ভূমি বিরোধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি প্রভাব বিস্তার, দখল বা কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করে সত্যতা বের করা জরুরি।