
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর দিয়াবাড়ি উত্তরা মেট্রো-৩ বিআরটিএ অফিসকে ঘিরে আবারও উঠেছে অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালচক্র ও ঘুষ বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ। মোটরসাইকেল মালিকানা বদলি শাখাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সেবাপ্রার্থীরা। তাদের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অথচ অতিরিক্ত টাকা দিলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে মালিকানা বদলি, ফাইল অনুমোদন ও কাগজ যাচাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মোটর যান পরিদর্শক কাউসার আলম। সেবাপ্রার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যোগদানের পর থেকেই অফিসজুড়ে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ছত্রছায়া ব্যবহার করে তিনি অফিসে এক ধরনের ,অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা,গড়ে তুলেছেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন তিনি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অফিসের আশপাশে সারাক্ষণ ঘোরাফেরা করা কয়েকজন নির্দিষ্ট দালাল সরাসরি সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার প্রলোভন দেখান। অভিযোগ রয়েছে, আব্দুল্লাহ ও রনি নামে দুই ব্যক্তি নিয়মিত কাউসার আলমের আশপাশে অবস্থান করে বিভিন্ন ফাইল “ম্যানেজ” করার কাজ করেন। তাদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলেই আটকে থাকা ফাইল দ্রুত ছাড় হয়, এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।একাধিক মোটরসাইকেল মালিক জানান, নির্ধারিত সরকারি ফি জমা দেওয়ার পরও নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। কখনও সার্ভার জটিলতা, কখনও স্বাক্ষরের অভাব, আবার কখনও সামান্য কাগজপত্রের ত্রুটি দেখিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। অথচ একই ফাইল দালালের মাধ্যমে জমা দিলে অস্বাভাবিক দ্রুততায় অনুমোদন হয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ কার্যত বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দালালের দ্বারস্থ হচ্ছেন।ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এত বড় সিন্ডিকেট পরিচালনা সম্ভব নয়। কারণ দালালদের অফিস কক্ষে অবাধ যাতায়াত, ফাইল আদান-প্রদান এবং নির্দিষ্ট টেবিলে প্রভাব বিস্তারের ঘটনা প্রায় প্রকাশ্যেই ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন মালিকানা বদলি, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস নবায়নসহ বিভিন্ন সেবা ঘিরে লাখ লাখ টাকা হাতবদল হচ্ছে।স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, কাউসার আলম চাকরিতে যোগদানের পর স্বল্প সময়ে পূর্বাচল ও উত্তরায় সম্পদের মালিক হয়েছেন, এমন অভিযোগও ঘুরছে বিভিন্ন মহলে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে বিষয়গুলো নিয়ে দুদক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানের দাবি তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।অনুসন্ধান চলাকালে প্রতিবেদকের সঙ্গে অসহযোগিতামূলক আচরণের অভিযোগও উঠেছে কাউসার আলমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তিনি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। এমনকি কিছু স্থানীয় কিশোর গ্যাং ও দালালচক্রকে ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও অভিযোগ করেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। এক পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে থাকা কিছু তথ্য ও নথি দেখানো হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলেও জানা গেছে।তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোটর যান পরিদর্শক কাউসার আলমের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সচেতন মহলের মতে, বিআরটিএ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সেখানে যদি প্রকাশ্যে দালালচক্র ও ঘুষ বাণিজ্য সক্রিয় থাকে, তাহলে জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, সিসিটিভি নজরদারি জোরদার, অনলাইন সেবা কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ করা এবং দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বানও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষায়, “সরকারি অফিসে গিয়েও যদি দালাল ছাড়া সেবা না মেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
(পর্ব ২) তৃতীয় পর্বের অপেক্ষা।