
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার সাভারের চাকুলিয়া এলাকায় গাড়িচালক শামীম আহাম্মেদের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা, অন্যদিকে নিহতের পরিবারের দাবি,এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তদের গ্রেফতার না হওয়া, মামলা তুলে নিতে চাপ, ভয়ভীতি ও অর্থের বিনিময়ে আপোষ মীমাংসার গুঞ্জনে পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিহত শামীম আহাম্মেদ পেশায় একজন গাড়িচালক ছিলেন। স্ত্রী মিম ও ছয় বছরের শিশু সন্তান মাহাবুবকে নিয়ে সাধারণ হলেও সুখের সংসার ছিল তার। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কয়েক মাস আগে শামীমের মোবাইল ফোনে অপরিচিত এক নারীর কল আসে। পরে সেই নারীর পরিচয় জানা যায় রিঙ্কু নামে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। তবে শামীম বুঝতে পারেননি, এই সম্পর্কই তার জীবনের জন্য ভয়ংকর ফাঁদ হয়ে উঠবে।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রিঙ্কুও বিবাহিত এবং তার স্বামী প্রবাসে থাকেন। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রিঙ্কু শামীমকে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি একপর্যায়ে শামীমের স্ত্রী জানতে পারলে পরিবারে অশান্তি শুরু হয়। এরপর শামীম ওই নারীর কাছ থেকে সরে আসতে চাইলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।অভিযোগ রয়েছে, রিঙ্কু ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন সময় শামীমকে ভয়ভীতি, হুমকি ও মামলার ভয় দেখাতে থাকে। এমনকি সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে সামাজিকভাবে অপদস্থ করারও হুমকি দেওয়া হয়। নিহতের পরিবারের দাবি, মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে শামীমকে মানসিকভাবে চাপে রাখা হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ, গত ২৩ এপ্রিল ২০২৬ চাকুলিয়া এলাকার নিজ বাড়িতে একা থাকা অবস্থায় রিঙ্কু ও তার সহযোগীরা সেখানে প্রবেশ করে শামীমকে বেধড়ক মারধর করে। এতে তিনি গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত জখম হন। ঘটনার পর চরম মানসিক ভেঙে পড়া অবস্থায় শামীম আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন বলে এলাকায় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে নিহতের পরিবারের দাবি,এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় স্ত্রী মিম ও বৃদ্ধ পিতা বাবুল মিস্ত্রির জীবন এখন আতঙ্কে কাটছে। পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর থেকেই অভিযুক্ত পক্ষ নানা কৌশলে মামলা তুলে নিতে চাপ সৃষ্টি করছে। কখনো ভয়ভীতি, কখনো টাকার প্রলোভন, আবার কখনো স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে আপোষের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি তাদের।এ ঘটনায় সাভার মডেল থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর-৯৭, তারিখ ২৫ এপ্রিল ২০২৬। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন,রিঙ্কু (২৫), তাহের (৪৫), রাজীব (২৮), রোমান (৪০), ফরহাদ (২৫), ফারদিন (২০) ও হান্নান (৫০)। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ৫ থেকে ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, মামলার পর থেকেই বনগাঁও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সোহেল রহমানসহ কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি আপোষ মীমাংসার জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন। তাদের মধ্যে তাহের, আখিল, রনি, তানজিল ও জুকু নামের কয়েকজনের নামও উঠে এসেছে। পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে হত্যা মামলা আপোষ করিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের একাংশের।নিহতের স্ত্রী মিম অভিযোগ করে বলেন,আমার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এটা কোনো আত্মহত্যা নয়। ঘটনার আগে তাকে মারধর ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে। এখন আমাদের মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাই।তিনি আরও বলেন,আমার ছয় বছরের ছেলে আজ বাবাহারা। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। দ্রুত সব আসামিকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান,মামলার তদন্ত চলছে। একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।তিনি আরও বলেন,পরিবারকে কেউ প্রভাবিত করছে এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে যদি এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।অন্যদিকে, মামলা আপোষে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বনগাঁও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সোহেল রহমান। তিনি বলেন,আমি কোনো আপোষ মীমাংসার সঙ্গে জড়িত নই। পুলিশ তদন্ত করবে, আদালত বিচার করবে। কিছু লোক আমার কাছে এসেছিল, তবে পাঁচ লাখ টাকায় মামলা আপোষের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, রহস্যজনক এই মৃত্যু ঘিরে একের পর এক অভিযোগ, প্রভাবশালীদের নাম উঠে আসা এবং মামলার ধীরগতির কারণে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন না হলে বিচার নিয়ে জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে।ঘটনার পর থেকে নিহত শামীমের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। শিশু মাহাবুব এখনো বুঝে উঠতে পারেনি তার বাবা আর ফিরবে না। আর স্বামী হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী মিম শুধু একটাই দাবি জানাচ্ছেন,আমার স্বামীর মৃত্যুর সঠিক বিচার চাই।