
নিজস্ব প্রতিবেদক:
মানিকগঞ্জের শিবালয়ে বালু মহাল নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে মিরাজ হোসেন (৪০) হত্যাকান্ডের ঘটনার দুইদিন পর মামলা দায়ের হয়। এ হত্যা ঘটনার মামলায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চল আলোকদিয়া এলাকায় বালু মহালের বিরোধের জেরে গুলি ও কুপিয়ে মিরাজ হোসেন(৪০)কে হত্যা করা হয়। নিহত মিরাজের বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার চর সাহাদিয়ার গ্রামের বাসিন্দা। তিনি তেওতা বালু মহালের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ঘটনার দুইদিন পর পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বহু নাটকীয়ভাবে রবিবার রাতে বালু মহালের ঠিকাদার কাউছার আলম খান বাদী হয়ে নতুন করে অভিযোগ দিয়ে শিবালয় থানায় একটি হত্যা মামলা নং-৬ দায়ের করেন।
পরিবারের পক্ষে নিহত মিরাজের মেজ ছেলে জিহাদ লিখিত অভিযোগ করেন শিবালয় থানায়। পরে নিজ এলাকা পাবনায় চলে আসেন। তারা চলে আসার পরে একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহলের টাকা ও ক্ষমতার দাপটে নিহতের পরিবারের লিখিত অভিযোগটি থানা মামলা হিসেবে রেকর্ড করতে দেয়নি। স্থানীয় বিভিন্ন,প্রভাবশালী মহলের সাথে দেন-দরবার শেষে স্থানীয় বালু মহালের ঠিকাদার কাউছার আলম খান হত্যাকান্ডের দুইদিন পর নিজে বাদী হয়ে নতুন করে অভিযোগ করে শিবালয় থানায় গত (৫-ই এপ্রিল) রবিবার রাতে হত্যা মামলাটি রেকর্ড করেন।
নিহতের পরিবার অভিযোগ,মিরাজের মূল হত্যাকারীদের আড়াল করার জন্য একটি প্রভাবশালী মহল পায়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। মিরাজের হত্যাকাণ্ডে স্থায়ীয় একটি সশস্ত্র চক্র সক্রিয় ছিল। নিহত মিরাজ এই সশস্ত্র চক্রটিকে প্রতি সপ্তাহে ২৫ থেকে ৩০ হাজার চাঁদা দিতেন,মিরাজ কয়েক সপ্তাহে চাঁদার টাকা না দেওয়াতে আর অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সাথে বালু বিক্রির টাকা ভাগাভাগির বিরোধ চলছিল। মিরাজের সাথে স্থানীয় শামীম ফকির নামের এক লোকের ঝামেলাও চলছিলো বলে জানা যায়। দুর্বৃত্তরা এসে প্রথমে এলোপাতাড়ি কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে ভীতির সৃষ্টি করেন। তারপরে ড্রেজারে উঠে হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে মিরাজকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে চর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যায়।
নিহতের পরিবারের দাবি,কে বা কাহারা মিরাজকে হত্যা করেছে আমরা কাউকে চিনি না। তবে স্থানীয় বালু ব্যবসা ও চাঁদার টাকা না দেওয়া কারণেই মূলত মিরাজকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের পরিবার প্রশাসনের নিকট অভিযোগ রেখে বলেন,মূল আসামিদের আড়াল করার জন্য স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ঘটনার দুইদিন পর বিভিন্ন নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে কাউসার আলমের নতুন করে অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি রেকর্ড করেন পুলিশ। নিহত মিরাজের বড় ছেলে তারেক অভিযোগ করে বলেন,(৩ এপ্রিল)শুক্রবার আমরা খবর পেয়ে ঘটনার দিনই আমাদের পরিবারের সকলেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই, ও আমার আব্বুর মৃত্যুর ব্যাপারে শিবালয় থানায় একটি (অজ্ঞাতনামা) কারোও নাম ছাড়াই অভিযোগ দিয়ে আমরা চলে আসি। অজ্ঞাতনামা অভিযোগের কারণ হিসেবে নিহতের ছেলে তারেক বলেন,আমার আব্বুকে কে বা কাহারা মেরেছে আমরা কেউ জানিনা, যেহেতু আমরা সেখানে থাকি না। তাই অজ্ঞাতনামা অভিযোগ দিয়েছি,পুলিশ তদন্ত করে বের করবে কারা আব্বুকে মেরেছে। কিন্তু আমাদের অভিযোগকে পুলিশ এজাহার ভুক্ত করেননি।ঘটনার দুইদিন পরে স্থানীয় প্রভাবশালী বালু মহালের ইজারাদার কাউসার আলম খান টাকা ও ক্ষমতার জোরে নিজে বাদী হয়ে নতুন করে পাঁচজনকে ও আরোও ৫-৬ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে অভিযোগ দায়ের করেন। তার এই অভিযোগের ভিত্তিতে শিবালয় থানা পুলিশ (৫ এপ্রিল) রাতে মামলাটি রেকর্ড করেন। তার বাদী হওয়ার ব্যাপারে আমাদের বলেও নাই আমরা কিছুই জানিনা। আমরা যে অভিযোগটি করেছিলাম সেখানে কারো নাম উল্লেখ করি নাই, অজ্ঞাতনামা হিসেবে অভিযোগ দায়ের করেছিলাম।
নিহত মিরাজের ছেলে আক্ষেপ করে বলেন, আমরা ঘটনার দিনই অভিযোগ করেছি, কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের অভিযোগকে মামলা হিসাবে রেকর্ড না করে,পুলিশ নতুন করে কাউসার আলমকে বাদী বানিয়ে মামলা রেকর্ড করে। যেহেতু ঘটনাস্থলে কাউসার আলমও ছিল না,তাহলে তাকে বাদী করেন কিভাবে? আমার আব্বু ওনার সঙ্গে কাজও করতেন না। উনি কিভাবে মামলার বাদী হয়? উনার কি বাদী হওয়ার এক্তিয়ার আছে? বাদী হলে হবে নিহতের রক্তের ভাই,ছেলে অথবা স্ত্রী। ঘটনার দিন থানায় তখন আমাদের পরিবারের সকলেই উপস্থিত ছিলাম। আমার মনে হয় নিশ্চয়ই আমার আব্বুর খুনের বিষয়ে ঠিকাদার কাওসার আলমের ও তার লোকজনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তা না হলে অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে আমরা যে অভিযোগটি করেছিলাম সেই অনুযায়ী মামলা নথিভুক্ত হইলে পুলিশ তদন্তে নামলেই কাউসার আলম ও তার লোকজন ফেঁসে যেতেন এই ভয়ে, কাওসার আলম উনার টাকার জোরে ক্ষমতার দাপটে এবং আমার আব্বুর মৃত্যুর সুযোগে উনি ওনার যারা শত্রু আছে তাদেরকে ফাসাঁনোর জন্যই আসামি করেছে। আমি মামলার কপি পড়েছি,সেখানে সিরাজগঞ্জের লোকদের আসামি করা হয়েছে। তাদেরকে আমরা চিনিনা জানিনা আমার আব্বু আমার আর আমার আম্মার কাছে যেখানেই যেতেন বলে যেতেন। আব্বু কোথায় কি করতেন আমরা জানতাম। আর সেখানে সিরাজগঞ্জের লোক এসে আমার আব্বুকে মারবে কিভাবে? তাদের সাথে আমার আব্বুর কোন শত্রুতা ও ছিল না। তবে আব্বুর সাথে কাউসার আলমের লোক শামিম ফকিরের সাথে একটা স্পিডবোট নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল। এ নিয়ে আমার আব্বু বেশ কিছুদিন ভয়ে ভয়ে থাকতেন এবং ওখানে গেলে পালিয়ে পালিয়ে যেতেন। আব্বু ওখানে যেতেন লিটন নামের একজন লোকের ভরসায় আর লিটন আমার আব্বুকে নিতো ওখানে কাজ করার জন্য। ঘটনা স্থলে আমার আব্বু সহ তিনজন ছিল আমরা শুনেছি জাহাঙ্গীর নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। আমরা পুলিশ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে যাই কিন্তু কাউকে পাই নাই,পরে শুনি জাহাঙ্গীর নামের ওই ভদ্রলোক আহত হয় নাই। তাই আমি সর্বশেষ কথা বলব যে, কেন আমাদের অভিযোগটি পুলিশ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেননি? আমি আবারও বলছি,আমরা অজ্ঞাতনামা অভিযোগ দিয়েছি। কাউসার আলম নিজে অভিযোগ দিয়ে বাদী হয়ে পরবর্তীতে মামলা করলো কেন? যেসব আসামিদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে আমরা কাউকে চিনি না জানি না। এটি যদি পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্ত করেন,তবে আমার মনে হয় নিরপরাধ কোন ব্যক্তির এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে না। নিরপেক্ষ তদন্ত করে আমার বাবার প্রকৃত খুনিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি করছি।
মিরাজ হত্যাকান্ডের বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহরম আলী বলেন,মিরাজ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আমরা মামলা নিয়েছি, ঘটনার দিন নিহতের পরিবার অভিযোগ দিয়েছিল। অন্য লোক বাদী হওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন,ঠিকাদার কাউসার আলম এখানকার বালু মহালের সবকিছু জানেন ও কারা কারা বালু উত্তোলন করেন কারা কারা ঠিকাদারি করেন। এ অঞ্চলের কাওছার আলম সব খবর রাখে সে ক্ষেত্রে সেই ভালো বলতে পারবে পুলিশের তদন্ত করতে সুবিধা হবে।আর মিরাজ সব সময় কাওছার আলমের সাথে টাচে ছিলেন। তবে এ ব্যাপারে আমরা বিভিন্ন দিক থেকে সূত্র নিয়ে কাজ করছি, ও পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সমন্বয়ে আমরা তদন্ত করছি,আমরাও চাই স্বচ্ছ নিরপেক্ষ তদন্ত মাধ্যমে পুলিশ মূল আসামিদের শনাক্ত এবং হত্যার আসল রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হবে। কোন নিরপরাধ ব্যক্তি যেন অযথা হয়রানি স্বীকার না হয় এটিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা কাজ করছি।